শুরুর কথা

প্রথমেই শিরোনামখানা এইরূপ দিবার সার্থকতা আলোচনা করিঃ
ইতঃপূর্বে আমি এই খেরোখাতায় প্রাককথন লিখিয়া সাধুবচন রচিবার প্রয়াসের প্রেক্ষাপটের কথা কিছু বলিয়াছিলাম, আজিকে আরও কিছু বলিবার সাধ জাগিল, সবই প্রেক্ষাপটের কথন নয়, মনের মধ্যে যাহা আসিবে তাহাই কহিব। এবম্বিধ কারণেই শিরোনাম এমতি।

এক্ষণে সাধুবচনের নামের অর্থ লইয়া আলোকপাত করা যাক; আমি শব্দ লইয়া মজা করিতে পছন্দ করি তাই এই খেরোখাতার নাম করিয়াছি দ্ব্যর্থবোধক । সাধুবচনের দুই অর্থ হইতে পারে । সাধারণ সন্ধি সমাসে হইতে পারে, সাধু’র (কহিত) বচন – ইহা এই সাধুবচনের অর্থ নহে – সেইরূপ হইবার কোন কারনও নাই, আমি সাধুজন নহি । তাহা হইলে হইতে পারে, “সাধু ভাষায় রচিত বচন” – ইহা সত্য বটে, আমি এইখানে সাধুভাষাতেই রচিব বটে; তবে আমার বন্ধুপ্রবর ও সহকর্মী শাওন আরেফিন যেরূপ আশঙ্কা বা আশা করিয়াছেন যে, “এই খেরোপাতাটি বিলুপ্তমান শ্লোক সংরক্ষনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করিবে। উদাহরণস্বরূপঃ মীনক্ষোভাকুল কুবলয়(!) তথাঃ মাছের তাঁড়নে যে পদ্ম কাঁপিতেছে।” — সেইরূপ হইবার কারন নাই । বরঞ্চ সাধুবচন-এ সাধুভাষার স্বাদু রূপ লইয়া সহজবোধ্য ও সর্বজনবোধ্য করিয়াই বঙ্গভাষায় মনোভাব প্রকাশ করিব । সংস্কৃত সন্ধি-সমাসের ভারে কুঁজো সাধুভাষা প্রকৃত বাংলা নয়; সংস্কৃতের জুজু সাধুভাষার উপর সিন্দাবাদের ভূতের ন্যায় চড়িয়া বসাতেই সংস্কৃতের ন্যায় সাধুভাষাও অপ্রচলিত হইয়া উঠিয়াছে ।
সাধুবচন নামের অর্থ এইরূপ কহিলেও অসত্য হইবে না যে, “সাধএর চ্চারিত বচন” । সাধুবচনে আমিই লেখিতেছি এবং আমার নাম সাধ-ই বটে । এইসকল তথ্য দিতেছি, কারন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেইরূপ করিতাম, সেইরূপ যদি কাহারো “সাধুবচন” খেরোখাতার নামকরণের সার্থকতা নিরূপণের ইচ্ছা জাগে (কষ্টকল্পনা করিতেছি, আসলে আমি নিজেই তো সার্থকতা নিরূপনে ব্যতিব্যস্ত রহিয়াছি) তাহা হইলে সে কিছু রসদ এইখান হইতে পাইতে পারে।

অনেকেই প্রশ্ন করিবে “কি লইয়া লিখিতে বসিয়াছি?” – কারন আমাদিগের অভ্যাস এইরূপ যে কেহ কোন কিছু কহিতে আসিলে, বিশেষ করিয়া এইরূপ আঁটোসাঁটো বাঁধিয়া ওয়েবমাধ্যমে গোলোযোগ করিয়া টঙে চড়িবার আয়োজন করিলে প্রশ্ন তো করিতেই পারে, প্রশ্ন করাই সাজে । আসলে তো ইহা বিষয়হীন লিখিবার কথা – যাহা মনে চাহিবে তাহাই লেখিব; সাধের মনে যা সাধ হইবে তাহাই অত্রস্থানে সাধুভাষ্যে প্রকাশ পাইবে।
সাধুবচন নাম বটে, তাই বলিয়া কি ইহা সাধুলোকের কথা হইবে – আলবৎ নহে । ইহাতে সাধু অসাধু সকল আলোচনাই স্থান লইবে । বাংলা সাহিত্যে বিবিধকালে নানান মহান লেখক লিখিয়াছেন – যাহাদিগের রচনা কালের পুরাণ হইয়া রহিয়া গিয়াছে, বহিয়া যাইতেছে ভবিষ্যতের দিকে ক্লাসিক রূপে । ‘ক্লাসিক’ বাংলা কেহ করেন ‘চিরন্তন’, কেহ বা কহেন ‘ধ্রুপদী’ (<ধ্রুবপদী – ধ্রুব পদ যাহার) । এইসব ধ্রুপদী চিরন্তন সাহিত্য লইয়া কচিৎ সম্যক আলোচনা করিব – অর্থাৎ কি না সমালোচনা করিব । আধুনিক কালের লেখা লইয়াও করিব । আবার বর্তমান কালে আমাদিগের আশেপাশে যাহা ঘটিয়া যাইতেছে তাহা লইয়াও লেখিব । আমার এই খেরোখাতার এক অনুপ্রেরণা হইল আমারই বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগে অধ্যয়নরত অনুজপ্রতীম সতীর্থ ‘সদানন্দ’ খান মোহাম্মদ ইরতেজা ও তাহার ওয়েবব্লগ ঘাসফড়িং এর স্বপ্ন – যদস্থলে সে বিভিন্ন বিষয়ে অতিশয় প্রীতিপ্রদ উপায়ে বিবিধ বিষয়ে সুন্দর আলোচনা করিয়া থাকে । তাহার ন্যায় আমারও কখনো সাম্প্রতিক বিষয় লইয়া লিখিতে সাধ হয়, যথেষ্ট সুযোগ না হওয়ায় পূর্বে লেখা হইয়া উঠে নাই, আশা করি পরবর্তীতে হইবে ।

রচনার বিষয়বস্তু যেরূপ হইতে পারে বাঙালি, বাঙালিয়ানা, বাংলা ভাষা সেইরূপ হইতে পারে বিবিধ বঙ্গীয় ও বৈশ্বিক সাহিত্য, নাট্য, সংস্কৃতি, চলচিত্র, চালচিত্র; হইতে পারে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, ধর্মের কথা কিংবা ধর্মতত্ত্ব, হইতে পারে ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব, নৃবিদ্যা কিংবা সম্পূর্ণ নার্ড (nerd) গিক (geek) দের ন্যায় বিষয়াদি । পাঠে স্বাদ পাইলে বা ভালো লাগিলে প্রকাশ্যে বলিবেন, মন্দ লাগিলে পশ্চাতে গালাইবেন – আপত্তি করিব না :-৯

প্রবন্ধ যেইরূপ হইতে পারে লেখার ধরন তেমনি রম্য কিংবা গল্প-ও গদ্যের অপর ধারা; আমি তো সেইরূপ-ও লেখিব; আপনারা যতই উচ্চবাচ্য করেন আমি কহিব, বরং আমার সকল রচনাই অল্প-বিস্তর রম্যরসে জারিত করিতে সচেষ্ট হইব । যদ্যপি শ্রী প্রমথ চৌধুরী, শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা (বিদ্যাসাগর নামেই যিনি অধিক পরিচিত), সৈয়দ মুজতবা আলী, আব্‌দুশ শাকুর প্রমুখের ন্যায় উইট বা রসবোধ আমার নাই (উপরন্তু তাহাদিগের সহিৎ তুলনা করিবার চেষ্টা যেরূপ পাপকর্ম হইলো তাহাও অমোচনীয়) – তথাপি আমি কিছুটা উইট রাখিবার চেষ্টা তো করিতেই পারি; মহান লেখকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়া আর যাহা হউক দূষণীয় নহে!