সালতামামিঃ ২০১১পাঠ

দুই সহস্র একাদশ সাল — খৃষ্টীয় অব্দের ২০১১তম বৎসর; বহুকাল ধরিয়া এই সালগণনা পদ্ধতিকে অ্যানো ডোমিনি বা “প্রভু’র বৎসর” বলিয়া আসিতেছি, কিন্তু অধুনা ইহাকে কমন এরা বা “সাধারণ সাল” বলিবার চল হইয়াছে – কারন এইটিই সর্বধিক ব্যবহৃত পঞ্জিকা-বৎসর যা একসময় কেবল চার্চ-শাষিত বা খৃষ্টানপ্রধান য়্যুরোপে ব্যবহৃত হইলেও এখন ধর্ম ও জাতি নির্বিশেষে তাবৎ দুনিয়াতেই ব্যবহৃত হইতেছে ; ডিজিটাল ব্যবস্থা, কম্পিউটারে, আন্তর্জাতিক মান্য ব্যবস্থায়ও এটিই একমাত্র সর্বজনস্বীকৃত সাল – সেজন্যই কমন এরা ।

যাহাই হৌক, প্রতিবছরের ন্যায় ২০১১-ও অনেক আশা আকাঙ্ক্ষা লইয়া আমাদের মাঝে আসিলেও নানাবিধ প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি নিয়াই এই বছরের সমাপ্তি – তাই বৎসরের শেষ ঘন্টায় বসিয়া (লিখিতে শুরু করিলেও শেষ করিতে পারি পরের দিবসে) ব্যক্তিগত, দেশীয় ও অন্যান্য আঙ্গিকে বৎসরটির কিছু দিক ফিরে দেখিতে উদ্যত হইলাম ।

ব্যক্তিগত পর্ব
২০১১ সাল আমার জীবনে মাইলফলক বৎসর না হইলেও বেশ কিছু ঘটনায় আলোকিত – গতবৎসরের শেষে পাসপোর্ট সংগ্রহের আবেদন করিলে মাত্র দুই কি তিন মাস অতিক্রান্ত না হইতেই এবৎসর জানুয়ারিতে আমি বাংলাদেশের পাসপোর্ট হাতে পাই । এই বৎসরেই আগস্টের শেষে আমি কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনে স্যামসং সদরদপ্তর – কোরিয়াতে দুই মাসের ভ্রমণে যাই । তার কিছু পূর্বেই আমি বিশ্বের সকল স্থানের জন্য মুসলিম নামাজাদি, ইফতার-সাহরির সময় গণনা করিবার ওয়েবভিত্তিক ওয়াক্তস্কোপ নামীয় এক বস্তু তৈয়ারি করি – কোরিয়া সফরে ইহা আমারও বিশেষ কার্যে আসে । গ্রীষ্মের শুরুতে আমি আমার ওয়েব সাইটের সহিৎ ওয়ার্ডপ্রেস নামক ওয়েব-প্রকাশনা সহায়ক বস্তুখানি সংযোজন করি এবং সময়ের স্বল্পতা থাকিলেও কিছু থিমও তৈরি করিয়া ফেলি – যার দরুন আমি “সাধুবচন” নামীয় এই খেরোখাতা প্রকাশ করিতে শুরু করিতে পারি; সাধুবচনে মূলত আমি সাধুভাষা চর্চা করিয়া নিজ মনোভাব প্রকাশের চেষ্টা করিতেছি – একই সাথে যাহাতে বাংলাভাষার এই বিশেষ স্বাদুরূপ কালেভদ্রে পঠিত-লিখিত হইয়া জীবিত থাকিতে পারে সেই আশাও প্রেরণার রূপ যুগাইয়াছে । কিছুকাল পর আমার কাব্য-কুকর্মের খাতা “সুলল সংগ্রহ“-ও ওয়েবমাধ্যমে প্রকাশ করিতে শুরু করিয়া দেই এবং সেই আনন্দে ধেই ধেই করিয়া নাচিয়া নতুন কতিপয় কাব্যও (নয়খানা পদ্য ও আষ্টখানা লিমেরিক) রচনা করিয়া বসি – এর পূর্বে প্রায় চারি বৎসর কাল ঠিকমত কাব্যচর্চা করিতেই পারি নাই ।
২০১০ সালে জন্মদিনোপলক্ষে আব্বার নিকট হইতে কম্পিউটারযোগে আঁকিবার জন্য ব্যবহৃত ড্রয়িং প্যাড উপহার পাইলে এই বৎসর তৎযোগে কিছু চিত্রাঙ্কেনরও অবকাশ হয় – তাহা সত্ত্বেও এই বৎসরে মাত্র পঞ্চখানি দেয়ালচিত্র কাস্টোমাইজ.অর্গ-এ প্রকাশ করিতে সক্ষম হই । ইহার মধ্যে অবশ্য একুশে ফেব্রুয়ারী লইয়া বাংলা বর্ণসমূহের সমন্বয়ে কৃত চিত্রখানি বন্ধুমহলে বিশেষ সমাদর প্রাপ্ত হয়। কিয়দ পরেই বাংলা নববর্ষ লইয়া কৃত নববর্ষ শিরোনামের কার্য – ঠিক মনঃপূত না হইলও ইহাও বেশ কদর পাইয়াছে । বিগত বছরের ন্যায় এই বছরেও বারকয়েক গুগল ডুডল বানাইতে ইচ্ছা পোষণ করিলেও আমি, সিয়াম, ফাহিম বা প্রতীকের মধ্যে কেউই কাজটি সম্পন্ন করিতে পারি নাই; পরিশেষে বিজয় দিবস উপলক্ষে দিবসের ২-৩দিন পূর্বে অকস্মাৎ সাইবারজবৎ জুড়িয়া গুগল ডুডল করিবার জোড় তৎপরতা শুরু হইলে আমার এক অনুজ আশিক রহমান অপু আমার একই দিবস উপলক্ষে কৃত বিজয় আনন্দে আজ এর উপর ভিত্তি করিয়া ডুডল প্রস্তাব করে । অতঃপর, সকলেই যখন জানিতে ও বুঝিতে পারে যে ১-২ দিনের মধ্যে কোন রূপেই গুগল ডুডল প্রদান সম্ভব নহে তখন সাইবার জনতা পরবর্তী একুশে ফেব্রুযারীতে অনুরূপ কিছু করিবার আশা প্রকাশ করে… আমি ও প্রতীক এইবার আর অলসতা না করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করি ।

জানুয়ারিতে আমার ইংরেজি ভাষার ব্লগখানি ১৫ সহস্র পাঠক ছাড়াইয়া যায় – বৎসর শেষে তাহা চল্লিশ সহস্র-ও ছাড়াইয়া যায় – এবছরের শুরুতেই উক্ত ব্লগখানিকে আমি আমার নিজস্ব ঠিকানা ins.nafsadh.com তে প্রকাশ করিতে শুরু করি যাহা পূর্বে ওয়ার্ডপ্রেস.কমের ঠিকানায় প্রকাশ হইতো ।

এবছর মার্চে আমার সুপ্রিয় পিতামহ অকস্মাৎই পরলোকগমণ করেন, অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁহাকে বিদায় দিয়া আসি ১১ মার্চ তারিখে। তিনি অসুস্থ হইয়া ঢাকায় হাসাপাতালস্থ হইলেও তাঁহার সহিত শেষ দর্শনের সুযোগ হয় নাই – এই ক্লেশ আমার রহিবে। তাঁহাকে হারনোর বেদনা আমাকে ও আমার পরিবারের সকলকে মর্মাহত করে। আল্লাহ তাঁহার আত্মার মাগফিরাত করুন ও তাঁহাকে জান্নাতের উত্তম স্থান দান করুন। আমীন॥

২০১১ সালের কতিপয় ঘটনার মধ্যে এই মূহুর্তে স্মৃত হইতেছে যে, জানুয়ারিতে আমার মাতৃকুলসম্বন্ধীয় ভ্রাতাভগ্নিগণের সহিৎ টাঙ্গাইলে বিশেষ মিলন হয়; এই মাসেই কতিপয় বন্ধুর সহিৎ বানিজ্য মেলা নামের কারবারে আমরা যাই – বন্ধুসহযোগে ইহা আমার প্রথম বানিজ্যমেলা ভ্রমণ, ইতঃপূর্বে পারিবারের সহিত যাওয়া হইয়াছিল – যদিও অধিক জনসমাবেশ আমাকে বিশেষ আনন্দিত করিতে পারে না । ফেব্রুয়ারির বইমেলা বাঙালির বিশেষ আনন্দের উৎস এবং এই বৎসর যথেষ্ট আয়েশের সহিৎ বার কয়েক বইমেলা গমন করিতে পারি – যদ্যপি পূর্বের ন্যায় বইমেলায় ভিড় আর দৃষ্ট হয় না – তথাপি বইমেলা আমার প্রাণের মেলা হইয়াই আসে। ২০১০ সালে পরীক্ষা থাকার দরুন বইমেলায় আসিতে পারি নাই, এবং তার আগের ০৭,০৮,০৯ ও বিশেষ আয়েশের সহিৎ বইমেলা ভ্রমণ হয় নাই। আমরা ইহার মাঝেই “বর্দ্ধমান হৌজ” তথা বাংলা একাডেমি মূল কার্যালয়-ও দর্শন করি । ফেব্রুয়ারিতে আমি অর্ক ও শোভনের সহিৎ প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন বা নাড়িকেল জিঞ্জিরা’য় অবকাশ ভ্রমণ করি – ইচ্ছা সত্ত্বেও সংবর্ষে এই একের অধিক আর সফরে যাইতে পারি নাই । পঞ্চবৎসর পূর্তি উপলক্ষে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট সিএসই ২কে৫) বন্ধুগণ একত্রে মিলিত হই মার্চের ৫ তারিখে । আমাদিগের পুরুষ বন্ধুগণের মধ্যে সর্বপ্রথম বিবাহের বন্ধনের আবদ্ধ হইল রাহ্‌হ্‌হ্‌ ভাই এই জুন মাসেই । রমাদানের মধ্যখানে হঠাৎ টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হইয়া আমি কিছুকাল হাসপাতালে যাপন করি – এতদহেতু আমাকে স্বীয় উদ্যোগে আয়োজিত বন্ধুসকলের ইফতার খানা-আয়োজন পরিত্যাগ করিতে হয়। সুস্থ না হইতেই আমি কোরিয়া ভ্রমণে চলিয়া যাই । কোরিয়াতে সিউল ও সুওন সংলগ্ন বিভিন্ন স্থান সন্দর্শন হয় ও বিশেষ অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত হই । অক্টোবরে স্বীয় ওয়েবগৃহের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করিতে সক্ষম হই । একালেই আমি প্রথম ত্রিমাত্রিক চলচ্চিত্র দর্শনের স্বাদলাভ করি – যদ্যপি মুভিখানার নির্মান বিশেষ প্রসিদ্ধ হয় নাই – তথামি ত্রিমাত্রিক চিত্র বলিয়া কথা । নভেম্বরে আমি আমার আলমা ম্যাতার তথা শিক্ষণমাতৃকা কুয়েট হইতে ঘুরিয়া আসি – উক্ত স্থান আমার নিকট বিশেষ আবেগের স্থান । আমাদিগের সুহৃদ অভি উচ্চশিক্ষার্থে মার্কিন মুলুকে গমন করে বছরের শেষলগ্নে ।ডিসেম্বরে পুনরায় চন্দ্রগ্রহণ সংঘটিত হয় – জুনমাসের চন্দ্রগ্রহণ মেঘরাজিকার হেতু দৃষ্ট না হইলেও এইটি সম্যক দৃষ্ট হয় । এইসকল ব্যতিকরেকেও আরো নানাবিধ ক্ষুদ্র-বৃহৎ ঘটনার দ্বারা পরিবৃত হইয়া বছর যাপিত হইলো… এক্ষণে ইহাকে বিদায় জানাইতেছি ।

দেশ ও বিশ্ব পর্ব
বর্ষটি দেশে ও বিশ্বে নানাবিধ আলোচিত ঘটনার দ্বারা অতিক্রান্ত হয় । জানুয়ারির মাঝামাঝি ফেলানির ঘটনায় সমগ্র দেশ বিক্ষুব্ধ হইয়া বৎসরের সূচনা করে, ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর কতিপয় ঘটনাও প্রভূত আলোড়ন সৃষ্টি করিয়াছিল । ১৭ ফেব্রুয়ারি এক অসাধারণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কার সহিত সম্মিলিতভাবে বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজনের শুভসূচনা করে – উদ্বোধন অনুষ্ঠান ভারতের শিধু সিং ও কতিপয় ব্যক্তি ব্যাতীত তাবৎ দুনিয়ায বিশেষ প্রসংশা পায় – লোকে কহিতে থাকে ক্রিকেটে এমন অনুষ্ঠান আর হই নাই। তবে আমরা বিশ্বকাপে দ্বিতীয় পর্যায় (রাউন্ড) এ যাবার আশা করিলেও তাহা হয় নাই – ফলে ক্রীড়ামোদি আমরা বিশেষ আশাহত হই ।
মার্চ মাসে ড. ইউনুস ও গ্রমীণ ব্যাংকের সহিত সরকারি আচরন লইয়া সারাদেশ বেশ চঞ্চল হইয়া উঠে – আদালতের রায় লইয়া বিবিসি মত দেয়, “আদালত যেন শাষকের দর্পন”। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান হইতেও এই ঘটনা লইয়া বেশ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসিতে থাকে ।
১১ মার্চে জাপানের সুনামি ও তাহার ফলশ্রুতিতে ফুকুশিমা ট্রাজেডি সমগ্র বিশ্বকে আলোড়িত করে, বিশেষ করিয়া প্রযুক্তিবিদগণ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রযুক্তিকে আরো গভীরভাবে ভাবিবার অবকাশ পান।
মার্চেই সাংসদ আন্দালিবের বক্তব্য বিশেষ আলোচনার সৃষ্টি করে ও বিভিন্নমাধ্যমে উহার ভিডিওচিত্র অবশ্য দ্রষ্টব্য হইয়া পরে । এপ্রিলে জাতীয় নারীনীতি লইয়া বিশেষ দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় এবং ইহা লইয়া হরতাল ও বিশেষ রণাবস্থার অবতারণা হয়।
মে মাসে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০ডলার হ্রাস হইলেও পক্ষান্তরে বাংলাদেশে লিটারপ্রতি দুই টাকা বৃদ্ধি হয় – পরবর্তীতে আরও কয়েক দফা গ্যাস ও তেলের মূলবৃদ্ধি ঘটে; বর্ষের শেষে আসিয়াও তেল লিটারপ্রতি ৫টাকা বাড়ে, গ্যাসের মূল্য ১৬ টাকা হইতে তিনগুণ বাড়িয়া যায় – বিদ্যুৎ ও গৃহস্থলী গ্যাস সরবরাহেরও অবস্থা তথৈবচ । মে মাসের এ সময়েই-ই রবি ঠাকুরের জন্মের দেড়শতবর্ষ জয়ন্তী পালিত হয় এবং এর কিছু পাশ্চাত্যকরণের বিশেষ সমালোচনার সৃষ্টি করে । জুনে ঢাকা ফ্যাশন উইক একাধারে ব্যবসায়িক সাফল্য ও নাগরিক সমালোচনা লাভ করে ।
ভিকারুন্নিসার পরিমল কাহিনী-ই থাকে জুলাইয়ের মূল আলোচনার বিষয় । জুলাইতে আদমশুমারির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যাহাতে দেশের জনসংখ্যা অনুমিত ও পূর্বের জরিপের তুলনায় কম বলিয়া প্রতিভাত হয় । আগস্ট মাসে, তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর সহ কিছু খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হইলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা লইয়া বিশেষ বিতন্ডা মঞ্চস্থ হয় । এই বৎসর আমেরিকা ও ভারতের মডেল অনুযায়ী বাংলাদেশেও “কে হতে চায় কোটিপতি” শীর্ষক অনুষ্ঠান শুরু হয় বাকের ভাই খ্যাত সাংসদ নূরের উপাস্থাপনায় । অক্টোবরে সাইবার জগতে বাঙালি-বাংলাদেশি প্রশ্ন কিছুটা আলোচনার অবকাশ পায় ও এই লইয়া আমার খেরোখাতায় পূর্বতন লেখাটি লিখিত হয় । পদ্মা সেতু লইয়া বৎসরের শেষদিকে মাঠ উত্তপ্ত হয়। টিপাইমুখি বাঁধ লইয়া সরকারের ভূমিকা প্রশ্ন সৃষ্টি করে নভেম্বর ও ডিসেম্বরেও । পাক-বাংলা ক্রিকেট খেলায় কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের পাকি-সমর্থন বিশেষ নিন্দা ও দুশ্চিন্তার বিষয় হইয়া ওঠে এ সময় । বিজয়ের মাসেই মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধে অবস্থান কারীদের নেতা হিসেবে পরিচিত গোলাম আযমের সাক্ষাৎকার অনেকের আলোচনায় উঠিয়া আসে; যুদ্ধাপরাধের বিচার সহ বেশ কিছু বিষয় এসময় আলোচিত হইতে থাকে।

উত্তাপসৃষ্টিকারী নানা ঘটনার হেতুই বোধ করি, বৎসরের শীত বেশ জাঁকোয়া রূপে আবির্ভূত হইলেও দক্ষিণায়নের দিন হইতেই হঠাৎ করিয়া শীত কমিয়া বেশ গরম অনুভূত হইতে থাকে ।

বাংলাদেশ এ বৎসর রাশিয়ার সহযোগিতায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির চুক্তি করে আবার রাশিয়ার সৈনিকদের প্রশিক্ষণ দেবার আরকটি চুক্তিও হয়।
২০১০ এ সৃষ্ট পুঁজিবাজার অস্থিরতা ২০১১ জুড়েও চলিতে থাকে ।

বৎসর জুড়িয়া বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক আলোচিত বিষয়ের মধ্যে স্থান লইয়াছিল মূলত আরব বসন্ত; এতদ্ব্যাতীত ফুকুশিমা পারমাণবিক কেন্দ্র, স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি, মার্কিন ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানি মূল্যের নিয়মিত হ্রাসবৃদ্ধি ইত্যাদি বিশ্বমাধ্যমে আলোচিত হইয়াছে ।

প্রযুক্তি পর্ব
বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক কোন বহুজাতিক কোম্পানির গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্যামসং আরএ্যান্ডডি ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশ করে – ইন্টেল, এলজি, এএমডি, আইবিএম সহ কতিপয় আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগার খুলিবার প্রচেষ্টার কথাও আমাদের কর্ণগোচর হয় । মাইক্রোসফটের ইমাজিন কাপে এবৎসরই বাংলাদেশ তলিকাভুক্ত হইয়া অংশ লয়, মাইক্রোসফট ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ৬ কে অতিবৃদ্ধ ঘোষণা করিয়া ইহা প্রতিস্থাপনে উদ্যত হয় । এবৎসর এইচটিএমএল ৫ প্রকাশিত হয় ও সকল প্রধান ব্রাউজার নতুন প্রযুক্তির উৎকর্ষে আরও ব্যবহার-মনোহর হইয়া উঠে । এপ্রিল ফুল বা বসন্তের বোকা বানাইবার উৎসবে গুগল এবার সর্বাধিক ধোকা (hoax) ছাড়িয়া বিশেষ খ্যাতি পায়, গুগলের সিইও পদ এরিক স্মিড্থ ছাড়িয়া দিবার পর প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ আবারো সিইও হন। গ্রীষ্মেই কিউবি তাহাদের ইন্টারনেট সংযোগের গতি পরীক্ষামূলক ভাবে দ্বিগুণ করিয়া দেয় ও পরে সকলের সংযোগ-গতিকে দ্বিগুণের স্থায়ী রূপান্তরিত করে । বিশ্বের সর্ববৃহৎ অনলাইল ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান জিংগা শেয়ার মার্কেটে প্রবেশ করে । গুগল জুন-জুলাইতে মরিচার ন্যায় লাল বর্ণ ধারণ করিতে শুরু করে ও গুগল প্লাস প্রকাশ করে – যাহা সূচনায় বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করিয়া খোমাখাতা ফেসবুককে হূমকির মুখে পতিতে করিলেও বছর শেষ না হইতেই গুগল প্লাস কোনক্রমেই ফেসবুক কে হটাইয়া মূল ধারা হইতেছে না – এইটি প্রতীয়মান হয় । এছাড়া, স্যামসং মোবাইল বিভাগের সফল সিটিও ওমর খান কোম্পানি ছাড়িয়া যান বৎসরের মধ্যদিকে; আগস্টের ৬ তারিখ ওয়েবের ২০ বছর পূর্ণ হয়; দোয়েল নামীয় বাংলাদেশে সংযোজিত ল্যাপটপ বাজারজাত হইয়াছে ২০১১ সালে । ফেসবুক এবর্ষেই তাহাদের প্রোফাইলের নতুন ধারণা টাইমলাইন প্রচলন করে ।
এই বৎসরেই আইবিএম পিসির ৪০ বৎসর পূর্ণ হয় এবং তাহা হইতে না হইতেই এই প্রযুক্তির পুরোযায়ীগণ কর্ম ও বিশ্ব ত্যাগের যাত্রা শুরু করেন । আগস্টে দায়িত্ব ছাড়িবার কিয়দপর অক্টোবরে দুনিয়াও ছাড়িয়া যান কম্পিউটার প্রযুক্তির অন্যতম মহান কারিগর স্টিভ জবস। একই মাসে প্রোগ্রামিং ভাষা সি ও প্রাচীন কম্পিউটার ব্যবস্থার জনক মহান ডেনিস রিচি-ও ইহধাম ত্যাগ করেন।

যাহাই হৌক, অন্যান্য বর্ষের ন্যায় ২০১১ও নানাবিধ ঘটনায় রঞ্জিত হইয়া আমাদের ছাড়িয়া গেলো।

২০১১ শেষ করিয়া ২০১২’র শুরুতেই দুটি দুঃসংবাদ শুনিলাম, এক বর্ষের প্রথম প্রহরে বুয়েটের রণক্ষেত্র হইবার ঘটনাটি জানিলাম – আর সকালের নিদ্রা ভাঙিল একজন সহপাঠী ও সুপ্রিয় বন্ধুর হঠাৎ আমাদের ছাড়িয়া যাইবার ঘটনা জানিয়া । দুইটিই অবশ্য ২০১১ তে ঘটিয়াছে, কিন্তু জানিতে পারি ২০১২তে । সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাইলেও তাই কহিতে পারিনা আসলে কিরূপ হইবে এই বর্ষ ।

Advertisements

বাংলাদেশি-বাঙালি প্রশ্নে

আজিকে খোমাখাতায় একখানা প্রশ্নের সম্মুখীন হইলাম; বাঙালি না বাংলাদেশী কোন পরিচয় বেশি গর্বের । উত্তর দিতে গিয়া প্রথমেই মনে আসিল, কেহ জিজ্ঞাসা করিলে, তৎক্ষণে অতিশয় গর্বের সহিতই কহি, বাংলাদেশ হইতে আসিয়াছি আমি ।

বাংলাদেশ শব্দখান অনেকটা আপন গৃহের অনুভূতি দেয় । আবার বাঙালি, বাংলা ভাষাভাষী এইসকল পরিচয়ের রহিয়াছে ভিন্নতর গৌরব-আভিজাত্য ও অনুভূতি ।
ইহা আমাদিগের উৎসের পরিচয় দেয়, ইহা বংশগৌরবের অংশ — কিন্তু ভারতে, আসামে, বিহারে, ত্রিপুরায় ও বাঙালি বাস করিয়া থাকে; ঠোক যেইরূপ ইরাকে, কুয়েতে, মিশরে, কাতারে, সাহারায় সকলেই আরব অথচ তাহাদের পরিচয় ইরাকি, কুয়েতি, মিশরী – ঢালাও ভাবে আরবি নয় । একইরকম, আম্রিকায় অনেক ইংরেজ-বংশধর রহিয়াছে কিন্তু তাহারা ইংলিশম্যান নহে, আবার ব্রিটেনেও থাকেন ইংলিশ, স্কটিশ, আইরিশ, – যাহাদের জাতীয়তা লিখিত হয় ব্রিটিশ । সুতরাং, বলিতে গেলে উভয় পরিচয়ই ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে আপন । বাংলাদেশ কহিলে আপন পাড়া, আপন গৃহ মনে হয় – বাঙালি কহিলে আপনার ভাই, না-দেখা আত্মার জন মনে হয় ।

তবুও যদি প্রশ্ন আসিয়াই যায়, কোনটা লয়ে অধিক গর্ব করিবো? কহিব, তবুও সবুজ এই পাসপোর্ট-খানাই না বড্ড বেশি ভালো লাগিয়া থাকে, তবুও বাংলাতেই ভাব জানাইতে-জানিতে মন চায় ।

কথন – ১

বহু দিবস যাবৎ কলম লইয়া বসা হইতেছে না; কহিবেন তা হইবার কী আর যো আছে? আধুনিক যুগ কলমের যুগ নহে, ইহা চাবিতক্তা আর মূষিকের । আমিও উহাই কহিতেছি, কলম-কীবোর্ড কোন কিছু লইয়াই আর লিখা হয় নাই বহু দিন – প্রায় দুই মাস হইতে চলিল । আজিকে তাই কিছু এলোমেলো লেখা লিখিতে মন করিল এবং লিখিতে বসিলাম ।

সাধুবচন নামীয় এই খেরোখাতা বানাইবার পর, আমি কিছু সংক্ষিপ্ত কর্মে লিপ্ত হইয়াছিলাম; এরই মধ্যে সর্বশেষ রমজানের প্রারম্ভে হঠাৎই মনে হইলো, নামাজের সময় লইয়া কিছু কাজ করা যাইতে পারে। নামাজের ওয়াক্ত বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভৌগলিক অবস্থানে বিবিধরূপ হয়; তবে কিছু নিয়ম মানিয়াই হয়। এই চিন্তা হইতেই ওয়াক্তস্কোপ বানাইতে বসি দু’সপ্তাহ পূর্বে। ভাবিয়াছিলাম শনি-রবির ছুটিতে বানাইয়া ফেলিব, কিন্তু চোখ বাবাজি উঠায় তা আর হয় নাই। ২৪ তারিখ রাত্রিতে কিছু কাজ করিতে শুরু করি এবং প্রতিদিন অফিস হইতে আসিয়া অতঃপর ঘন্টা দুয়েক বসিতে পারি। ঢাকা শহরের যাহা অবস্থা তাহাতে কোন কর্মেই সময় দিইবার উপায় রহে না । প্রত্যূষে ন’টার অফিস ধরিতে আরো সকাল সাড়ে সাতটায় রওনা হইতে হয়; ছ’টার অফিস শেষ করিয়া আসিতে আসিতে আটটা-নয়টা তো বাজিয়াই যায় । বাসে করিয়া আসিতে গেলে আরও বেশি, বরং হাঁটিয়া আসিলে উপকার হয় – স্বাস্থ্য আর সময় উভয়ই বাঁচে। তবে দশ-বারো সহস্র কদম হাঁটিতে কষ্ট হইয়া তো যায়ই বটে! যাইহোক একরকম কসরৎ করিয়া অতঃপর ৩০-৩১ তারিখে কিছু কাজ করিয়া ওয়াক্তস্কোপ বানাইয়া ফেলিলাম, ওখানে এখন বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরের নামাজের ওয়ক্ত দেখা যাইবে, কেবল দক্ষিণ (ডান) পার্শ্ব হইতে নিজ দেশ আর শহরের নাম নির্বাচন করিতে হইবে, টাইমজোন খানা ঠিক করিতে হইবে । সাধারণত ইহা বাংলাদেশে প্রচলিত হিসাব মানিয়া ওয়াক্ত গণনা করিলেও, উত্তর (বাম) পার্শ্ব হইতে বিবিধ প্রণালী হইতে ১খানা বাছিয়া লওয়া যাইবে । বানাইয়া ইহা ওয়েবে দিলাম, কিছু লোক পছন্দও করিল বটে। এক দুজনের কাজে যদি বা আসেও তাতেও আমার আরাম হয়।

বঙ্গদেশে আমার বাস, বিচিত্র এই দেশ — একে তাহার রূপের তুলনা হয় না, তায় আবার দেশের মানুষও বিদিক; নানাবিধ কীর্তি কর্মে সারাদিন কাটিয়া যায় । এদেশবাসী সম্ভবত সবচেয়ে পারঙ্গম অপরের অনুপকার সাধনে, নাইলে কি আর প্রতিদিন সংবাদপত্রে পাঠ করি একজন আরেকজনের নামে কুৎসা গাহিতেছে কিংবা শিক্ষক তাহার ছাত্রীদিগকে ভালোবাসার আধিক্যে বলপূর্বক উপস্ত্রী বানাইয়া ফেলিতেছে ?! কিংবা, নিরপরাধ কিশোরকে অপরাধী বানাইয়া দিতেছে আরাক্ষা-বাহিনী স্বয়ং? অথবা, ডাকাত মনে করিয়া শবে বরাত নামীয় দেশে ধর্মীয় আমেজে পালিত রাত্রিতেই বা কীহেতু কিছু তরুণ ছাত্রকে আমরা গণপিটুনি দিইয়া শবে-মউৎ বানাইয়ে দিতেছি?

আমরা আবার খুব হুজুগ প্রবণ-ও বটে… একটা ঘটনা ঘটিলে আমরা তাহা লইয়া খুব উল্লম্ফন করি; কিছুকাল পর আরেক ঘটনা মিডিয়া আমাদিগকে পান করায়… আমরা সেই সুরাপাত্রে চুমুক দিয়া পূর্বের ঘটনা ভুলিয়া যাই। একদিন দেশ দশ ও কোটি মানুষের কিছু ঘটনা নিয়া আমরা হাপিত্যেশ করি, দেশপ্রেম – বিশ্বচিন্তন কিংবা সবুজ ধরিত্রীর প্রেরণায় আন্দোলন করিতে করিতেই দুইদিন পরে যখন দেখি একজন বিশেষ মানুষের উপর নির্যাতন হইতেছে, তখন আগের ব্যক্তি বা ঘটনা “মুড়ি খা” বলিয়া নতুন ঘটনা নিয়া লাফাইয়া পড়ি; ফলত পূর্বের ওই বিশেষ ঘটনায় আর জনতার মনসংযোগ থাকে না বিধায় সরকার কিংবা দায়ী কর্তৃপক্ষ যথেচ্ছভাবে ওই ঘটনা ধামাচাপা দিয়া দেয়; আমাদের হুদা আন্দোলন বেহুদা খরচের খাতায় পড়িয়া রয় । উত্তম! আমাদিগের তো এইরূপই করা সাজে; চিৎকার ম্যৎকারই আমাদিগের ‘বিধেয়’, ‘উদ্দেশ্য’ তো নিমিত্ত মাত্র ।

যাহাই হউক, এখন রমজান মাস চলিতেছে; মুসলমানগণ উক্ত মাসে সিয়াম সাধনা করিয়া এবং অধিক সালাত ও ইবাদতাদি করিয়া আল্লাহ্‌’র সান্নিধ্য লাভে উদ্যত হয়; বিশেষত ইহা আমাদিগের আত্মিক শুদ্ধি ও ঈমানি পুনরোজ্জীবনের সুযোগ বলিয়া গণ্য হয় । তদুপরি এই মাস লইয়া আলোচনা সমালোচনা কম হয় না বৈকি । কেউ রোজা রাখিবার ফজিলত আর কেউবা না রাখার তরিকৎ বাৎলায়; কারো আলোচনা বেরিয়ে আসে ধর্মের অসারতা নিয়া, কেউবা অধর্মের নিন্দা করে এ মাসেই। যাবতীয় দ্বন্দ বিদ্বেষ কাজ করিতে থাকে ঠিক আপন গতিতেই । 😦 উপরন্তু, সবচাইতে আনন্দের বিষয় হইয়া দাঁড়ায়, বাজারগমণ… যেসব পণ্য দুমাস আগে ১শ টাকা দরে ক্রয় করিতে হইতো এই মাসে তাহা ন্যূনতম দুইশত টাকা মূল্যে ক্রয় করিবার সুযোগ পাই; বেশি মূল্যের জিনিস কিনিয়া নিজেকে ধনী ভাবিতে কাহার না ভালো লাগে? যাহই হৌক্‌, মাস শেষে আসিবে ঈদ —— আহাঃ, সেই আনন্দেই তাহা হইলে আপাতত লেখনি থামাইয়া আজিকে এখানেই ‘কথন’ সমাপ্ত করি!

চাঁদের হরণ

বাঙালি সর্বদাই দড় রোমান্টিক, সৌন্দর্যরস তাহাদের প্রবল, সেইসাথে প্রকট তাহাদের উপমার বাহার। আম্মো বাঙালি, তাই আমিও কম যাই না বাঙালির এইসব গুণে! যাহা হউক, আমরা চন্দ্র-কে বড়ই পেয়ার করিয়া থাকি; উন্মাতাল সৌন্দর্য, নিরূপম নিষ্কলঙ্ক লাবণ্য ইত্যাদি বহুগুণ রূপ বুঝাইতে আমরা চাঁদবদনের উল্লেখ করিয়া থাকি। আবার, আমরা জ্ঞাতি গোষ্ঠীতে চাঁদ মিঞা, অমুক “চন্দ্র” তমুক কিংবা কিষাণ চন্দর – মানবসন্তানের ইত্যাকার বিবিধ নামও শুনিয়া থাকি। চন্দ্রাবতী, চাঁদনী এরূপ নামও বৈ কম নাই। আবার ইতিহাসের পাতা উল্টাইলে দেখা যাইবে যে, চন্দ্র বংশ নামীয় এক রাজবংশ আমাদের ভূমিতে শাসন করিত। আজকাল চলিত ভাষার ব্যবহারে চন্দ্র শব্দ হারাইয়া যাইতেছে, তদস্থলে “চাঁদ” আর কথ্য ভাষায় কখনোবা “চাঁন” এরকম শব্দ অধিক শ্রুত হয়। স্মৃতি হাতড়ে দেখি, শৈশবে ব্যাকরণের বাগধারা অধ্যায়ে আমরা “অর্ধচন্দ্র দান” বচনখানি অধ্যয়ন করি যাহার অর্থ গলা-ধাক্কা দিয়া তাড়াইয়া দেওয়া।

আজিকে শুনিলাম, আকাশের যে চাঁদ – ধবধবে সফেদ চন্দ্র, তাহাকে নাকি কে হঠাৎ অর্ধচন্দ্র দিয়া আকাশ হইতে খেদাইয়া দিবে! কি বিচিত্র কথা। আজিকে পূর্ণিমা – অর্থাৎ কিনা পূর্ণচন্দ্র, পূর্ণচন্দ্রকে দিবে অর্ধচন্দ্র! নাহ্‌, হাসিয়া বাঁচি না। এইরকম খবর শুনিয়া, সিদ্ধান্ত লইলাম, সারারাত্র বসিয়া আকাশপানে চাহিয়া দিইব চন্দ্র প্রহরা। চাঁদমামুকে লইয়া যাইতে দিব না কিছুতেই।

আকাশ হইতে চন্দ্র হারাইয়া যাইবার ঘটনা-কে অনেকে বলে চন্দ্রগ্রহণ, আমি কইব চন্দ্রহরণ। হিন্দু পুরাণে ইহার উল্লেখ রইয়াছে, বলা হয় রাহু চন্দ্র কে গিলিয়া খাইলে চন্দ্রগ্রাস হয়। বিবিধ উপাখ্যান হইতে জানা যায় যে:
রাহু হইতেছে মায়াদানবের ভ্রাতা দানব বিপ্রচিত্তি’র ও সিংহিকার সন্তান। সমুদ্রমন্থন হেতু অমৃত উঠিয়া আসিলে, দেবগণ তাহা খাইবার মনস্থির করে; কিন্তু সেইরূপ করিবার পূর্বেই রাহু অমৃত পান করিতে শুরু করিয়া দেয়। রাহু অসুর বলিয়া সে অমৃতের ভাগ পাইবে না, এবং রাহুর এহেন কীর্তির কথা চন্দ্রদেব ও সূর্যদেব রাষ্ট্র করিয়া দেয়; তৎক্ষনাত বিষ্ণুর স্ত্রীরূপধারী অবতার মোহীনি রাহুর শিরচ্ছেদ (নাকি ধরচ্ছেদ) করিয়া দেয়। ততক্ষণে অমৃত কিছু মাথা ও গলদেশে থাকিয়া যাওয়ায় রাহুর মাথা অমর হইয়া যায় কিন্তু ধর মরিয়া যায়। তারপর হইতেই ক্ষোভবশত রাহু নিয়মিত চন্দ্র ও সূর্য কে গ্রাস করিয়া শোধ লইতেছে। ইহাই হইতেছে চন্দ্রগ্রহণের একখানা বহুকাল যাবৎ জানা মূল রহস্য।

এই উপাখ্যান ছিল ভালো ছিল, কিছুকাল পূর্বে বিজ্ঞানীগণ আসিয়া ভিন্নতর কারন ব্যাখ্যা করিলেন। বিজ্ঞানীদিগের লইয়া এই এক যন্ত্রণা, সবকিছুতেই তাহারা যুক্তি দিয়া ব্যাখ্যা করিয়া আসল কাহিনী জানাইয়া দিতে চান। তাহারা কহেন, পৃথিবী ও চন্দ্রের গতিপথ এইরূপ যে, পূর্ণিমার কালে চন্দ্র, সূর্য ও পৃথ্বী একই রেখায় থাকে এবং কখনোবা তাহার সমপাতিত হইয়া যায়। আর তা হইলেই দুনিয়া চন্দ্রকে ঢাকিয়া দেয়। ক্যায়া আজিব বাৎ! পৃথিবী যদি চন্দ্রকে ঢাকিয়াই দিল তাহা হইলে কী দুনিয়ার তাবৎ মানুষ যাইয়া চন্দ্রে পতিত হইবে না?

যাহা হইক, আপাতত এইটুক লিখিয়াই কলম থামাইলাম; সময় হইয়া গিয়াছে, গিয়া চন্দ্রকে প্রহরা দিতে হইবে। সেই সাথে মূল রহস্য কি তাহও জানিয়া ও দেখিয়া আসি।

বাস ভাড়া লইয়া

একদা এক রাজ্যে কতিপয় মনুষ্য ‘রাজনগর’ নামীয় নগরে বসবাস করিত । নগরীখানা অতিশয় খাশা এবং দেশের ব্যবসা-বানিজ্য, শিল্প কারখানা সকলই উক্ত নগরীতেই আসিয়া বাসা বাঁধিয়াছিল; রাজ্যের যাবতীয় সুযোগ সুবিধাও কেবল এই নগরীতে পাওয়া যাইত । নানাবিধ কারনে নগরের জনসংখ্যা প্রতিদিন বাড়িতে বাড়িতে নগরের সকল লোক উপচাইয়া পড়িতে লাগিল । এইরকম উপচাইয়া পড়া লোক–সকল প্রতিদিন ‘ঘোড়ায় চরিয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল’ এই পুঁথি পাঠ করিতে করিতে আপন গৃহ হইতে কর্মালয়েরর উদ্দেশ্যে রওনা করিত । কিছু লোক যাহাদিগের আপন মোটরবাহন রহিয়াছে তাহারা নিজ বাহনে আয়েশের সহিৎ যাত্রা করিত – আর যাহাদের সেইরূপ ব্যবস্থা নাই তাহাদের বাহন বিশালাকৃতির বাস । এইসকল বাসে পঞ্চাশ বসিতে পারিত এবং বসিবার মাঝের সরু স্থানে আর পঞ্চাশ-ষাট জন অতিশয় আমোদের সহিৎ গমনাগমন করিত । আমোদের উৎস হিসেবে তাহাদিগের জন্য ব্যবস্থা ছিল, শীতকালে বিশেষ উত্তাপ এবং গ্রীষ্মে যখন তখন বারিধারায় ভিজিয়া ও কর্দমাক্ত হইয়া দেশমাতৃকার স্বাদ লাভের দুর্লভ সুযোগ । এছাড়াও পিছন হইতে ধাক্কা, সামনে হইতে গুঁতো খাওয়ার সুযোগও প্রায়শঃ-ই হইয়া থাকে। প্রয়োজনে বিবিধ নারীপুরুষের বাহারি দস্তুর পোষাক পরিচ্ছদ ও বিবিধ ভাষণ শুনিয়াও অতিশয় আমোদ হইত। বাস ও মোটরবাহন যে বাহনেই যাত্রা করা হউক, গন্তব্য কুড়ি মিনিটের হইলে গন্তব্যে পৌঁছাইতে নিদেনপক্ষে এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট লাগিত । ভাগ্য এত সুপ্রসন্ন না হইলে সে সময় দাড়াইতে পারে দুই ঘন্টা বা তাহরও অধিক।

এইসকল সুযোগ সুবিধার মধ্যে হঠাৎ করিয়া বাসের মালিকগণ বাস ভাড়া শতকরা ২০-৪০ হারে বাড়াইয়া দিলেন। কতিপয় ছিদ্রান্বেষী ব্যক্তি ইহাকে অপকর্ম হিসেবে চিহ্নিত করিলেও আসলে ইহাতে প্রভূত উত্তম উদ্দেশ্য রহিয়াছে।
প্রথমত, জনগণ বহুকাল যাবৎ দাবী করিয়া আসিয়াছিল যে বাসের ও যাতায়ত ব্যবস্থার উন্নতি করা হউক। আমরা জানি ভালো ও উন্নত বস্তু মাত্রেই তাহার মূল্য কিংবা ভাড়া বেশি হইবেই। সুতরাং যাহার ভাড়া অধিক তাহার গুণগত মান উন্নত। বাস ভাড়া বাড়াইয়া তাই সকল যাত্রীকেই পূর্বের বাসেই আরও উন্নত সুযোগ ও সেবা পাবার ব্যবস্থা করা হইল।
দ্বিতীয়ত, বাস ভাড়া বাড়াইবার ফলে কিছু লোকের জন্য বাসের ভাড়া অতি উচ্চ হইবে বিধায় তাহারা বাসে উঠিবে না, ফলে বাসে ভিড় কমিয়া যাইবে।
তৃতীয়ত, বাসের দুর্মূল্য হেতু অনেকেই বাসে না উঠিয়া হাঁটিয়া যাইবে। হণ্টন স্বাস্থ্যের জন্য অতি হিতকর ব্যায়াম এবং হণ্টনের দরূণ মনুষ্য দেহের প্রভূত উপকার হইবে। ফলত জাতীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি হইবে।
চতুর্থত, বাসের ভাড়া বৃদ্ধিতে বাস মালিকগণের আয় বাড়িবে ফলতঃ রাজ্য অধিক কর আদায় করিবে ও সেই কর দিয়া প্রজাসকলের সুযোগ সুবিধা আরও বাড়াইয়া দিবে।

এত সকল সুফল থাকা স্বত্তেও বাসের ভাড়া বৃদ্ধির বিরোধিতা করিবার কি কারন থাকিতে পারে তাহা এই অধমের বোধগোম্য হইতেছে না 😉

গগণবিহারীর আকাশপি

একদা এক রাজ্যে বালুকাবেলা নামীয় শহরকে কেন্দ্র করিয়া এক বিশেষ ধরণের ব্যবসা গড়িয়া উঠিয়াছিল । এই ব্যবসা বিশ্বব্যাপিয়া তাহারা করিত এবং এরকম ব্যবসায়ী গোষ্ঠীও ছিল প্রচুর । তাহাদিগের মধ্যে বেশ নাম করিয়াছিল “মার্‌কশ্যপ”, “গুলতি” ও “মুখোচ্ছবি” নামীয় কতিপয় বেনিয়া গোষ্ঠী।

মার্‌কশ্যপ অতি দীর্ঘকাল ধরিয়া সকলের বাড়িঘর কেমনে চালনা (operate) করিবে তাহার জন্য সুবিধা করিয়া দিয়া আসিতেছিল, এছাড়াও তাহারা বিবিধ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সংস্থা চালাইবার, অর্থাদির হিসাব রাখিবার, সুন্দরভাবে লিখিবার প্রদর্শন করাইবার জন্য বিবিধ উপকরণ তৈয়ার ও বিক্রয় করিয়া আসিয়াছিল । তাহার প্রায় সকল পণ্য অল্প বিস্তর মূল্যে জনতার নিকট বিক্রয় করিত । এসব করিয়া তাহারা যথেষ্ট নাম, যশ ও অর্থ কামায়াছিল।

গুলতি নামক এক যেই বেনিয়াগোষ্ঠী ছিল তাহাদিগের মূল কর্ম ছিল খোঁজাখুঁজি করিয়া দেওয়া । কাহার দোকানে কি রহিয়াছে, কোন স্থানে গেলে কি পাওয়া যাইবে – এইসব তথ্য যেমন গুলতি সবাইকে জানাইত তেমনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন কথা ও তথ্য খুঁজিয়া পাইতেও তাহারা সাহায্য করিত । তাহাদিগের আর ব্যবসা ছিল বিজ্ঞাপন প্রদান ও পুস্তক বিক্রয় । এর ছাড়া তাহারা সবার মধ্যে যোগাযোগ করাইবার বিভিন্ন ব্যবস্থাও করিত।

আর ছিল মুখোচ্ছবি । মার্‌কশ্যপের ও গুলতির চাইতেও অনেক অল্প বয়সের বেনিয়া গোষ্ঠী মুখোচ্ছবি — তাহাদিগের মূল ব্যবসা হইল লোকজনের বন্ধুসকলের হিসাব রাখা। কোন বন্ধু কি করিতেছে, কাহার কি অবস্থা ইত্যাদি মুখোচ্ছবি ব্যবহার করিয়া একে অপরকে জানাইতে পারিত — ছবি, লেখা ইত্যাদি প্রকাশ করিয়া, চিঠিপত্রাদি পাঠাইয়া।

মার্‌কশ্যপ, গুলতি ইহাদেরও পণ্য রহিয়াছে চিঠিপত্র পাঠাইবার, আলোচনা করিবার ইত্যাদি বিবিধ প্রকারের — একের ব্যবসার উন্নতি তাই কখনোবা অপরের ব্যবসার ক্ষতি করিত।

এইরূপ কতিপয় বেনিয়া গোষ্ঠীর বাহিরেও ছিল অনেক ছোট বড় বেনিয়া – যাহারা নানান রকম পণ্য সামগ্রী বানাইয়া প্রভূত নাম কামইতো । কিন্তু অবস্থা এমন হইয়াছিল যে, কিছুকাল অতিবাহিত হইলেই বৃহৎ বণিকগণ অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যবসাসকল কিনিয়া লইয়া নিজ নিজ ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ঘটাইতো।
এইরূপ আরো একবার ঘটিল যখন, গগণবিহারী সাহেব তাহার বিখ্যাত “আকাশপি” নামক ব্যবসাখানা বিক্রয় করিয়া দিতে উদ্যত হইলো।

গগণবিহারী সাহেবের আকাশপি একখানা অতি জনপ্রিয় বস্তু; ইহাতে নানাকিছু করা সম্ভব হইয়া থাকে, যেমন দূরের কাহারো সহিৎ কথা বলা, তাৎক্ষণিক পত্রাদি প্রেরণ এমনকি বহুদূরে যে বা যাহারা বসিয়া রহিয়াছে তাহাদিগের দর্শন লাভও সম্ভবপর হইয়াছে । অকস্মাত গগণবিহারী সাহেব যেইক্ষণে আকশপি বিক্রয় করিতে চাহিল তৎক্ষণাত আসিয়াই তাহা কিনিতে চাহিল দুর্দান্ত প্রতাপশালী গুল্‌তি – বিবিধজনের ব্যবসা কিনিয়া লওয়া যাহার বিশেষ শখ এবং মুখোচ্ছবি – সর্বমানবেরে একই সূত্রে বাঁধিয়া যোগাযোগ করাইয়া দেওয়া যাহার আপ্তবাক্য । এই দুইজনেই চারি নিযুত আস্‌রফি করিয়া ক্রয়মূল্য কহিয়া কিনিবার চেষ্টা চালাইতেছিল । হঠাৎ করিয়াই মার্‌কশ্যপ ঘটনাস্থলে আসিল এবং ভাবিয়া দেখিল যে তাহারা যদি আকাশপি নামক জাদুকরি বস্তু পায় তাহা হইলে মার্‌কশ্যপের বিশেষ উপকার হয় । যেমন, তাহাদিগের ‘জীবন্ত’ নামীয় যে বিশেষ সেবা রহিয়াছে এবং বনেদিগোষ্ঠিদিগকে তাহার যেসব পণ্যসেবা দিয়া থাকে, তাহার সহিৎ এই আকাশপির গুণাগুণ জুড়িয়া দিলে বেশ হয় । ইহা ছাড়া মার্‌কশ্যপের তৈয়ারি খেলিবার যন্ত্র গুননবাক্স ও নাতালের সহিৎ আকাশপি লাগাইয়া দিলে এইসকল পণ্যের ক্রেতাসংখ্যা বহুগুণ বাড়িবে । তাহাদিগের হাতে বহন করা যায় এমন কথা বলিবার যন্ত্র ‘বহমান জানালা’ তেও এই সুবিধা বিশেষ আকর্ষণ আনিবে । সুতরাং মার্‌কশ্যপ অতি উচ্চমূল্য – সাড়ে আষ্ট নিযুত আস্‌রফি দিয়া আকাশপি কিনিয়া লইলো।

অবশেষে দেখা যাইতেছে, কিনিতে না পারিলেও লাভ মুখোচ্ছবি’র-ও হইতেছে । মার্‌কশ্যপ মুখোচ্ছবি-কে বিশেষ স্নেহের দৃষ্টিতে দেখিয়া থাকে এবং তাহারা কারবারিতে অংশীদারও বটে । ফলতঃ দেখা যাইবে যে মুখোচ্ছবি-ও গগণবিহারীর আকাশপি হইতে সুবিধা প্রাপ্ত হইবে।

যাহা হাউক এই বালুকাবেলা নগরের কান্ডকীর্তী বুঝা বড়ই দায় । কি হইতে যে কি হয় আমাদিগের ন্যায় সাধারণ মানুষ যাহারা – তাহাদিগের নাতিদীর্ঘ এন্টিনায় তাহা স্পর্শ করিতে অক্ষম॥

বিঃদ্রঃ এই গল্পের সকল চরিত্র ও স্থান কাল্পনিক; বিশেষ করিয়া আকাশপি, মার্‌কশ্যপ, গুলতি, মুখোচ্ছবি কোনক্রমেই Skype, Microsoft, Google বা Facebook নহে, বালুকাবেলা-ও সিলিকন ভ্যালী নহে। কেহ কষ্ট কল্পনা করিয়া বাস্তব জগতের কোন কিছুর সহিৎ মিল বা সম্পর্ক খুঁজিয়া পাইলে সর্ব-দোষ তাহার

শুরুর কথা

প্রথমেই শিরোনামখানা এইরূপ দিবার সার্থকতা আলোচনা করিঃ
ইতঃপূর্বে আমি এই খেরোখাতায় প্রাককথন লিখিয়া সাধুবচন রচিবার প্রয়াসের প্রেক্ষাপটের কথা কিছু বলিয়াছিলাম, আজিকে আরও কিছু বলিবার সাধ জাগিল, সবই প্রেক্ষাপটের কথন নয়, মনের মধ্যে যাহা আসিবে তাহাই কহিব। এবম্বিধ কারণেই শিরোনাম এমতি।

এক্ষণে সাধুবচনের নামের অর্থ লইয়া আলোকপাত করা যাক; আমি শব্দ লইয়া মজা করিতে পছন্দ করি তাই এই খেরোখাতার নাম করিয়াছি দ্ব্যর্থবোধক । সাধুবচনের দুই অর্থ হইতে পারে । সাধারণ সন্ধি সমাসে হইতে পারে, সাধু’র (কহিত) বচন – ইহা এই সাধুবচনের অর্থ নহে – সেইরূপ হইবার কোন কারনও নাই, আমি সাধুজন নহি । তাহা হইলে হইতে পারে, “সাধু ভাষায় রচিত বচন” – ইহা সত্য বটে, আমি এইখানে সাধুভাষাতেই রচিব বটে; তবে আমার বন্ধুপ্রবর ও সহকর্মী শাওন আরেফিন যেরূপ আশঙ্কা বা আশা করিয়াছেন যে, “এই খেরোপাতাটি বিলুপ্তমান শ্লোক সংরক্ষনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করিবে। উদাহরণস্বরূপঃ মীনক্ষোভাকুল কুবলয়(!) তথাঃ মাছের তাঁড়নে যে পদ্ম কাঁপিতেছে।” — সেইরূপ হইবার কারন নাই । বরঞ্চ সাধুবচন-এ সাধুভাষার স্বাদু রূপ লইয়া সহজবোধ্য ও সর্বজনবোধ্য করিয়াই বঙ্গভাষায় মনোভাব প্রকাশ করিব । সংস্কৃত সন্ধি-সমাসের ভারে কুঁজো সাধুভাষা প্রকৃত বাংলা নয়; সংস্কৃতের জুজু সাধুভাষার উপর সিন্দাবাদের ভূতের ন্যায় চড়িয়া বসাতেই সংস্কৃতের ন্যায় সাধুভাষাও অপ্রচলিত হইয়া উঠিয়াছে ।
সাধুবচন নামের অর্থ এইরূপ কহিলেও অসত্য হইবে না যে, “সাধএর চ্চারিত বচন” । সাধুবচনে আমিই লেখিতেছি এবং আমার নাম সাধ-ই বটে । এইসকল তথ্য দিতেছি, কারন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেইরূপ করিতাম, সেইরূপ যদি কাহারো “সাধুবচন” খেরোখাতার নামকরণের সার্থকতা নিরূপণের ইচ্ছা জাগে (কষ্টকল্পনা করিতেছি, আসলে আমি নিজেই তো সার্থকতা নিরূপনে ব্যতিব্যস্ত রহিয়াছি) তাহা হইলে সে কিছু রসদ এইখান হইতে পাইতে পারে।

অনেকেই প্রশ্ন করিবে “কি লইয়া লিখিতে বসিয়াছি?” – কারন আমাদিগের অভ্যাস এইরূপ যে কেহ কোন কিছু কহিতে আসিলে, বিশেষ করিয়া এইরূপ আঁটোসাঁটো বাঁধিয়া ওয়েবমাধ্যমে গোলোযোগ করিয়া টঙে চড়িবার আয়োজন করিলে প্রশ্ন তো করিতেই পারে, প্রশ্ন করাই সাজে । আসলে তো ইহা বিষয়হীন লিখিবার কথা – যাহা মনে চাহিবে তাহাই লেখিব; সাধের মনে যা সাধ হইবে তাহাই অত্রস্থানে সাধুভাষ্যে প্রকাশ পাইবে।
সাধুবচন নাম বটে, তাই বলিয়া কি ইহা সাধুলোকের কথা হইবে – আলবৎ নহে । ইহাতে সাধু অসাধু সকল আলোচনাই স্থান লইবে । বাংলা সাহিত্যে বিবিধকালে নানান মহান লেখক লিখিয়াছেন – যাহাদিগের রচনা কালের পুরাণ হইয়া রহিয়া গিয়াছে, বহিয়া যাইতেছে ভবিষ্যতের দিকে ক্লাসিক রূপে । ‘ক্লাসিক’ বাংলা কেহ করেন ‘চিরন্তন’, কেহ বা কহেন ‘ধ্রুপদী’ (<ধ্রুবপদী – ধ্রুব পদ যাহার) । এইসব ধ্রুপদী চিরন্তন সাহিত্য লইয়া কচিৎ সম্যক আলোচনা করিব – অর্থাৎ কি না সমালোচনা করিব । আধুনিক কালের লেখা লইয়াও করিব । আবার বর্তমান কালে আমাদিগের আশেপাশে যাহা ঘটিয়া যাইতেছে তাহা লইয়াও লেখিব । আমার এই খেরোখাতার এক অনুপ্রেরণা হইল আমারই বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগে অধ্যয়নরত অনুজপ্রতীম সতীর্থ ‘সদানন্দ’ খান মোহাম্মদ ইরতেজা ও তাহার ওয়েবব্লগ ঘাসফড়িং এর স্বপ্ন – যদস্থলে সে বিভিন্ন বিষয়ে অতিশয় প্রীতিপ্রদ উপায়ে বিবিধ বিষয়ে সুন্দর আলোচনা করিয়া থাকে । তাহার ন্যায় আমারও কখনো সাম্প্রতিক বিষয় লইয়া লিখিতে সাধ হয়, যথেষ্ট সুযোগ না হওয়ায় পূর্বে লেখা হইয়া উঠে নাই, আশা করি পরবর্তীতে হইবে ।

রচনার বিষয়বস্তু যেরূপ হইতে পারে বাঙালি, বাঙালিয়ানা, বাংলা ভাষা সেইরূপ হইতে পারে বিবিধ বঙ্গীয় ও বৈশ্বিক সাহিত্য, নাট্য, সংস্কৃতি, চলচিত্র, চালচিত্র; হইতে পারে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, ধর্মের কথা কিংবা ধর্মতত্ত্ব, হইতে পারে ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব, নৃবিদ্যা কিংবা সম্পূর্ণ নার্ড (nerd) গিক (geek) দের ন্যায় বিষয়াদি । পাঠে স্বাদ পাইলে বা ভালো লাগিলে প্রকাশ্যে বলিবেন, মন্দ লাগিলে পশ্চাতে গালাইবেন – আপত্তি করিব না :-৯

প্রবন্ধ যেইরূপ হইতে পারে লেখার ধরন তেমনি রম্য কিংবা গল্প-ও গদ্যের অপর ধারা; আমি তো সেইরূপ-ও লেখিব; আপনারা যতই উচ্চবাচ্য করেন আমি কহিব, বরং আমার সকল রচনাই অল্প-বিস্তর রম্যরসে জারিত করিতে সচেষ্ট হইব । যদ্যপি শ্রী প্রমথ চৌধুরী, শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা (বিদ্যাসাগর নামেই যিনি অধিক পরিচিত), সৈয়দ মুজতবা আলী, আব্‌দুশ শাকুর প্রমুখের ন্যায় উইট বা রসবোধ আমার নাই (উপরন্তু তাহাদিগের সহিৎ তুলনা করিবার চেষ্টা যেরূপ পাপকর্ম হইলো তাহাও অমোচনীয়) – তথাপি আমি কিছুটা উইট রাখিবার চেষ্টা তো করিতেই পারি; মহান লেখকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়া আর যাহা হউক দূষণীয় নহে!