চলতি পাঠ ১

পাঠকসকল! সাধুবচনে বহুকাল পরে আবারো স্বাগতম; আজিকের লেখ্য “চলতি পাঠ” । নামে এই প্রকাশমাধ্যম সাধুবচন, ইহাতে যা লিখিত হয় সকলি সাধুজনের ভাষ্যে বঙ্গীয় ভাষার সাধু রূপে, তাই এই রচনার শিরোনাম চলতি পাঠ হইলেও ইহা চলিত ভাষায় লিখিত হইবে এইরূপ ভাববার অবকাশ নাই । চলিত ভাষা, আরও সঠিকভাবে বলিলে চলিত ভাষার নানারূপে আমরা বাঙালিরা কথা বলিয়া থাকি । একদা প্রমিত সাধু ভাষায়ই সর্বত্র লেখা হইতো, আজিকে ইত্তেফাক নামীয় সংবাদপত্রেও আর সাধুভাষার ব্যবহার প্রত্যক্ষ হয় না ।

পরিতাপের বিষয় এই যে আমরা, বাংলা ভাষাভাষীগণ, সাধুভাষায় আজ আর বিশেষ আরাম অনুভব করি না । সকেলই “ইংলিশ আন্‌ডারস্ট্যান্ড, নো প্রবলেম হ্যাস্‌” আর “উর্দু হিন্দি ভি কাফি আচ্ছা তারিকা সে সামঝতে হ্যায়” কিন্তু বাংলা ভাষার সাধু রূপ দেখিবামাত্র তাহাদিগের নিকট ইহা হিব্রুভাষার ন্যায় প্রতিভাত হয়, যেন ইহা কস্মিনকালেও মানুষের বোধগম্য নহে! যদিওবা এই কালেও হিব্রুভাষার বহুৎসকল ব্যবহারকারী আছেন এবং তাহারাও মানুষও বটেন, তথাপি… । এই নাহয়, গেল লেখ্যরূপ সাধুভাষা – আয়াশে বোধহম্য নহে! আমাদিগের কখনো কখনো বা বাংলাদেশে ব্যবহৃত কিছু কথ্যভাষার রূপ বুঝিতেও সমস্যা হইয়া থাকে। উদাহরণ হিসেবে আসিতে পারে, শ্রীহট্ট তথা সিলেটের ভাষা – যদ্যপি, ইহাকে ঠিক বাংলা ভাষার উপভাষা বলা যায় না, নিজ গুণে ও মহিমায় এই ভাষারূপের রহিয়াছি স্বতন্ত্র রূপ, স্বাদ, গন্ধ, রহিয়াছে নিজস্ব শব্দরাজি, নিজস্ব বাক্যরীতি; তাই ছিলটি ভাষা ভাষাতাত্বিক বিচারে একটি স্বতন্ত্র ভাষার মর্যাদা পায় ও এক কোটির অধিক ভাষাভাষী লইয়া দুনিয়ার ৭৯তম বৃহত্তম ভাষারও মর্যাদা পাইয়া থাকে । উল্লেখ্য যে, প্রাচীন বাংলায় যেকালে বাংলা কি লিপিতে লেখা হইবে তাহার মান নির্ধারিত হয় নাই, তৎকালে সিলটি নাগরী লিপির উদ্ভব হয় ও ষোড়শ হইতে বিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন লোকসাহিত্যের লেখ্য বাহন হিসেবে এই লিপির ব্যবহার হইতে থাকে । সিলটি নাগরী লিপির প্রসার ও ঐতিহাসিক মর্যাদার কারনে উইনিকোডেও এই লিপির স্থান রইয়াছে । সিলটি ভাষার সহিৎ, একইভাবে চাটগাঁইয়া বুলি তথা চট্টগ্রামের কথ্য ভাষার নাম উল্লেখ করিতে হয় । যদিওবা, চাটগাঁইয়া বুলি কেবলি কথ্যভাষা রূপেই ব্যবহৃত হয় ও অতি প্রাচীন কাল হইতেই চট্টগ্রামের সাহিত্যিকগণ বাংলা ভাষাতেই সাহিত্যচর্চা করিয়া আসিয়তেছেন ।

যাহা হৌক, আলোচ্য বিষয় মূলত, চলতি ঘটনা । আজিকাল দেশে ও বিশ্বে অনেক ঘটনাই চলমান আর অনেক ঘটনাই পত্রপত্রিকা, ইন্টারনেট, টিভিচ্যানেলে ভাসমান, দৃশ্যমান, বিবদমান । বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অবশ্যই আজিকে সবচেয়ে আলোচিত ও সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপ্রাপ্ত ঘটনা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচারে লঘু সাজা দান ও তার প্রেক্ষিতে পূর্ণ শাস্তির দাবীতে শাহবাগের মোড়ে প্রতিবাদ সমাবেশ । দশ পনেরজনের থেকে শুরু সেই প্রতিবাদ বিসংবাদ নিমিষেই লাখো মানুষের গণসমাবেশে পরিণত হয়, গনজোয়ারের মতোই; সুখের বিষয় এই সুবিশাল যজ্ঞে কেউ যখন পরিশ্রান্ত হইয়া কিয়দকাল অবসর লইতেছে সেই অবকাশে আরো শত মানুষ জমা হইতেছে; কেউ উপস্থিত না হইতে পারিলে খোমাখাতা তথা ফেসবুক যোগে নিজ নিজ সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করিতেছে, দেশে বিদেশে শাহবাগের মতই আরো অনেক স্থানে একই দাবিতে তাহারা উপস্থিত হইতেছে । এইরূপ আবেগপ্রবণ বাঙালির সার্বজনীন সম্পৃক্ততাপূর্ণ উদ্যোগ কালে কালে দেখা গিয়াছে; এই আবেগের যে মূল চালিকাশক্তি, যে মূল প্রেরণা, যে স্বপ্ন তাহা ধরিয়া রাখিতে হইলে আনাগত ভবিষ্যত লইয়াও সুচিন্তিত উদ্যোগ লইতে হইবে ।

এখন ফাল্গুন মাস, চারিদিকে গাছে গাছে পাতা গজাইতেছে – কিশোরকালের রচনার ন্যায় এই কথা লিখিতে পারিতাম; সমস্যা যা হইতেছে তাহা হইলো চারিপাশে গাছ খুজিয়া পাওয়া দুষ্কর বলিয়াই পাতা গজাইতেছে কি না তা প্রত্যক্ষ করিতে পারিতেছি না । তথাপি, রিকশায় রিকশায়, বোটানিকালে-রমনায়, খাবার রেস্তোঁরায়, আনাচা কানাচে, চিপায় চাপায় আমরা দেখিতে পারিতেছি যুগলবন্দীর মহোৎসব । পহেলা ফাল্গুন বাঙালির ঐতিহ্যবাহী প্রকৃতিপ্রেমী উৎসবে বাসন্তী রঙে ললনাদের সাথে প্রেমপিয়াসী নানা বয়সের সাবালক ঘুরিতে বাহির হইয়া থাকে এই দিনে; আমি এই দিনেও প্রভাতেও বিগত মাঘের সকল সকালের ন্যায় শয্যাত্যাগ করিয়া ক্লান্তিমগ্ন অফিসের কর্মযজ্ঞে দিনাতিপাত করিয়াছি আর দিবসপ্রান্তে একইরূপেই বাসে নিদ্রাযাপন করিতে করিতে গৃহে ফিরিয়া আসিয়াছি । ইহার পরেরদিন, ২রা ফাল্গুন – গিফট ব্যবাসয়ীদের প্রচারে বিশেষ প্রসারপ্রাপ্ত ভ্যালেন্টাইন দিবস বা ভালোবাসা দিবস উদযাপিত হয় । এইদিনে বিশেষ পাওনা, কপোত-কপোতীর ঝাপাঝাপির দরূন রাস্তায় জ্যামের আধিক্য আর হৃদয়ে-হৃদয়ে টানাটানি প্রকাশের চাপে পিষ্ট হইয়া পুষ্পরাজির অকাল মরণ; পুষ্পসকলের এই মরণে হাত পা ফুলিয়া কলাগাছ, তালগাছ, বটগাছ হইয়াছে অনেক ফুলব্যবসায়ীর । যে গোলাপ ৫ টাকায় বিকোতে চায়না, এইদিনে তাহাই পঞ্চাশ টাকায় পাইলে ক্রেতাগণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, কে লইবে সে গোলাপ, প্রেয়সীকে দেবার প্রত্যাশায় । ফাল্গুন – চৈত্র দুমাসকেই পঞ্জিকায় বসন্ত বলা হইলেও প্রকৃত বসন্ত যেন কেবলই এই ফাল্গুন । এই একমাসেই তাই বাঙালির মাঝে প্রেম, পিরিতী, পরিণয় বাড়াবাড়ি রকম বাড়িয়া যায় । খোমাখাতায় বন্ধুবান্ধবের সখীবন্ধন আর প্রেমের আলাপন বহুগুণে টাইমলাইনে আর হোমপেজে দৃষ্ট হইতে থাকে । পাশাপাশি পরিণয় অনুষ্ঠানাদিও পাড়ায় পাড়ায় বড় বেশি করে চক্ষুগোচর হইতে থাকে । কার্ত্তিকে অনেক প্রাণীর যুগলবন্ধনের তোড় বাড়িয়া থাকে । প্রকারান্তরে, সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের কামনার সময় এই বসন্তেই আসিয়া থাকে । এইকালে, কোন কোন একাকী তরুণের আর তরুণীর পুষ্পহীন বসন্ত কাটিতে থাকে অনেকের পুষ্পসমাহারে জর্জরিত বিয়ের আসর আর প্রেমের পসরা দেখিতে দেখিতে; এক ফাল্গুন তাহাদের শেষ হয় পুষ্পহীন আরেকটি ফাল্গুন না আসিবার কামনায় । অন্যদিকে, নির্দয় পরিহাস ও প্রকৃতি তাহাদের জন্য আরো একখানা পুষ্পহীন ফাল্গুন প্রস্তুত করিতে ব্যস্ত হইয়া পরে ।

Advertisements

চাঁদের হরণ

বাঙালি সর্বদাই দড় রোমান্টিক, সৌন্দর্যরস তাহাদের প্রবল, সেইসাথে প্রকট তাহাদের উপমার বাহার। আম্মো বাঙালি, তাই আমিও কম যাই না বাঙালির এইসব গুণে! যাহা হউক, আমরা চন্দ্র-কে বড়ই পেয়ার করিয়া থাকি; উন্মাতাল সৌন্দর্য, নিরূপম নিষ্কলঙ্ক লাবণ্য ইত্যাদি বহুগুণ রূপ বুঝাইতে আমরা চাঁদবদনের উল্লেখ করিয়া থাকি। আবার, আমরা জ্ঞাতি গোষ্ঠীতে চাঁদ মিঞা, অমুক “চন্দ্র” তমুক কিংবা কিষাণ চন্দর – মানবসন্তানের ইত্যাকার বিবিধ নামও শুনিয়া থাকি। চন্দ্রাবতী, চাঁদনী এরূপ নামও বৈ কম নাই। আবার ইতিহাসের পাতা উল্টাইলে দেখা যাইবে যে, চন্দ্র বংশ নামীয় এক রাজবংশ আমাদের ভূমিতে শাসন করিত। আজকাল চলিত ভাষার ব্যবহারে চন্দ্র শব্দ হারাইয়া যাইতেছে, তদস্থলে “চাঁদ” আর কথ্য ভাষায় কখনোবা “চাঁন” এরকম শব্দ অধিক শ্রুত হয়। স্মৃতি হাতড়ে দেখি, শৈশবে ব্যাকরণের বাগধারা অধ্যায়ে আমরা “অর্ধচন্দ্র দান” বচনখানি অধ্যয়ন করি যাহার অর্থ গলা-ধাক্কা দিয়া তাড়াইয়া দেওয়া।

আজিকে শুনিলাম, আকাশের যে চাঁদ – ধবধবে সফেদ চন্দ্র, তাহাকে নাকি কে হঠাৎ অর্ধচন্দ্র দিয়া আকাশ হইতে খেদাইয়া দিবে! কি বিচিত্র কথা। আজিকে পূর্ণিমা – অর্থাৎ কিনা পূর্ণচন্দ্র, পূর্ণচন্দ্রকে দিবে অর্ধচন্দ্র! নাহ্‌, হাসিয়া বাঁচি না। এইরকম খবর শুনিয়া, সিদ্ধান্ত লইলাম, সারারাত্র বসিয়া আকাশপানে চাহিয়া দিইব চন্দ্র প্রহরা। চাঁদমামুকে লইয়া যাইতে দিব না কিছুতেই।

আকাশ হইতে চন্দ্র হারাইয়া যাইবার ঘটনা-কে অনেকে বলে চন্দ্রগ্রহণ, আমি কইব চন্দ্রহরণ। হিন্দু পুরাণে ইহার উল্লেখ রইয়াছে, বলা হয় রাহু চন্দ্র কে গিলিয়া খাইলে চন্দ্রগ্রাস হয়। বিবিধ উপাখ্যান হইতে জানা যায় যে:
রাহু হইতেছে মায়াদানবের ভ্রাতা দানব বিপ্রচিত্তি’র ও সিংহিকার সন্তান। সমুদ্রমন্থন হেতু অমৃত উঠিয়া আসিলে, দেবগণ তাহা খাইবার মনস্থির করে; কিন্তু সেইরূপ করিবার পূর্বেই রাহু অমৃত পান করিতে শুরু করিয়া দেয়। রাহু অসুর বলিয়া সে অমৃতের ভাগ পাইবে না, এবং রাহুর এহেন কীর্তির কথা চন্দ্রদেব ও সূর্যদেব রাষ্ট্র করিয়া দেয়; তৎক্ষনাত বিষ্ণুর স্ত্রীরূপধারী অবতার মোহীনি রাহুর শিরচ্ছেদ (নাকি ধরচ্ছেদ) করিয়া দেয়। ততক্ষণে অমৃত কিছু মাথা ও গলদেশে থাকিয়া যাওয়ায় রাহুর মাথা অমর হইয়া যায় কিন্তু ধর মরিয়া যায়। তারপর হইতেই ক্ষোভবশত রাহু নিয়মিত চন্দ্র ও সূর্য কে গ্রাস করিয়া শোধ লইতেছে। ইহাই হইতেছে চন্দ্রগ্রহণের একখানা বহুকাল যাবৎ জানা মূল রহস্য।

এই উপাখ্যান ছিল ভালো ছিল, কিছুকাল পূর্বে বিজ্ঞানীগণ আসিয়া ভিন্নতর কারন ব্যাখ্যা করিলেন। বিজ্ঞানীদিগের লইয়া এই এক যন্ত্রণা, সবকিছুতেই তাহারা যুক্তি দিয়া ব্যাখ্যা করিয়া আসল কাহিনী জানাইয়া দিতে চান। তাহারা কহেন, পৃথিবী ও চন্দ্রের গতিপথ এইরূপ যে, পূর্ণিমার কালে চন্দ্র, সূর্য ও পৃথ্বী একই রেখায় থাকে এবং কখনোবা তাহার সমপাতিত হইয়া যায়। আর তা হইলেই দুনিয়া চন্দ্রকে ঢাকিয়া দেয়। ক্যায়া আজিব বাৎ! পৃথিবী যদি চন্দ্রকে ঢাকিয়াই দিল তাহা হইলে কী দুনিয়ার তাবৎ মানুষ যাইয়া চন্দ্রে পতিত হইবে না?

যাহা হইক, আপাতত এইটুক লিখিয়াই কলম থামাইলাম; সময় হইয়া গিয়াছে, গিয়া চন্দ্রকে প্রহরা দিতে হইবে। সেই সাথে মূল রহস্য কি তাহও জানিয়া ও দেখিয়া আসি।

বাস ভাড়া লইয়া

একদা এক রাজ্যে কতিপয় মনুষ্য ‘রাজনগর’ নামীয় নগরে বসবাস করিত । নগরীখানা অতিশয় খাশা এবং দেশের ব্যবসা-বানিজ্য, শিল্প কারখানা সকলই উক্ত নগরীতেই আসিয়া বাসা বাঁধিয়াছিল; রাজ্যের যাবতীয় সুযোগ সুবিধাও কেবল এই নগরীতে পাওয়া যাইত । নানাবিধ কারনে নগরের জনসংখ্যা প্রতিদিন বাড়িতে বাড়িতে নগরের সকল লোক উপচাইয়া পড়িতে লাগিল । এইরকম উপচাইয়া পড়া লোক–সকল প্রতিদিন ‘ঘোড়ায় চরিয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল’ এই পুঁথি পাঠ করিতে করিতে আপন গৃহ হইতে কর্মালয়েরর উদ্দেশ্যে রওনা করিত । কিছু লোক যাহাদিগের আপন মোটরবাহন রহিয়াছে তাহারা নিজ বাহনে আয়েশের সহিৎ যাত্রা করিত – আর যাহাদের সেইরূপ ব্যবস্থা নাই তাহাদের বাহন বিশালাকৃতির বাস । এইসকল বাসে পঞ্চাশ বসিতে পারিত এবং বসিবার মাঝের সরু স্থানে আর পঞ্চাশ-ষাট জন অতিশয় আমোদের সহিৎ গমনাগমন করিত । আমোদের উৎস হিসেবে তাহাদিগের জন্য ব্যবস্থা ছিল, শীতকালে বিশেষ উত্তাপ এবং গ্রীষ্মে যখন তখন বারিধারায় ভিজিয়া ও কর্দমাক্ত হইয়া দেশমাতৃকার স্বাদ লাভের দুর্লভ সুযোগ । এছাড়াও পিছন হইতে ধাক্কা, সামনে হইতে গুঁতো খাওয়ার সুযোগও প্রায়শঃ-ই হইয়া থাকে। প্রয়োজনে বিবিধ নারীপুরুষের বাহারি দস্তুর পোষাক পরিচ্ছদ ও বিবিধ ভাষণ শুনিয়াও অতিশয় আমোদ হইত। বাস ও মোটরবাহন যে বাহনেই যাত্রা করা হউক, গন্তব্য কুড়ি মিনিটের হইলে গন্তব্যে পৌঁছাইতে নিদেনপক্ষে এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট লাগিত । ভাগ্য এত সুপ্রসন্ন না হইলে সে সময় দাড়াইতে পারে দুই ঘন্টা বা তাহরও অধিক।

এইসকল সুযোগ সুবিধার মধ্যে হঠাৎ করিয়া বাসের মালিকগণ বাস ভাড়া শতকরা ২০-৪০ হারে বাড়াইয়া দিলেন। কতিপয় ছিদ্রান্বেষী ব্যক্তি ইহাকে অপকর্ম হিসেবে চিহ্নিত করিলেও আসলে ইহাতে প্রভূত উত্তম উদ্দেশ্য রহিয়াছে।
প্রথমত, জনগণ বহুকাল যাবৎ দাবী করিয়া আসিয়াছিল যে বাসের ও যাতায়ত ব্যবস্থার উন্নতি করা হউক। আমরা জানি ভালো ও উন্নত বস্তু মাত্রেই তাহার মূল্য কিংবা ভাড়া বেশি হইবেই। সুতরাং যাহার ভাড়া অধিক তাহার গুণগত মান উন্নত। বাস ভাড়া বাড়াইয়া তাই সকল যাত্রীকেই পূর্বের বাসেই আরও উন্নত সুযোগ ও সেবা পাবার ব্যবস্থা করা হইল।
দ্বিতীয়ত, বাস ভাড়া বাড়াইবার ফলে কিছু লোকের জন্য বাসের ভাড়া অতি উচ্চ হইবে বিধায় তাহারা বাসে উঠিবে না, ফলে বাসে ভিড় কমিয়া যাইবে।
তৃতীয়ত, বাসের দুর্মূল্য হেতু অনেকেই বাসে না উঠিয়া হাঁটিয়া যাইবে। হণ্টন স্বাস্থ্যের জন্য অতি হিতকর ব্যায়াম এবং হণ্টনের দরূণ মনুষ্য দেহের প্রভূত উপকার হইবে। ফলত জাতীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি হইবে।
চতুর্থত, বাসের ভাড়া বৃদ্ধিতে বাস মালিকগণের আয় বাড়িবে ফলতঃ রাজ্য অধিক কর আদায় করিবে ও সেই কর দিয়া প্রজাসকলের সুযোগ সুবিধা আরও বাড়াইয়া দিবে।

এত সকল সুফল থাকা স্বত্তেও বাসের ভাড়া বৃদ্ধির বিরোধিতা করিবার কি কারন থাকিতে পারে তাহা এই অধমের বোধগোম্য হইতেছে না 😉

গগণবিহারীর আকাশপি

একদা এক রাজ্যে বালুকাবেলা নামীয় শহরকে কেন্দ্র করিয়া এক বিশেষ ধরণের ব্যবসা গড়িয়া উঠিয়াছিল । এই ব্যবসা বিশ্বব্যাপিয়া তাহারা করিত এবং এরকম ব্যবসায়ী গোষ্ঠীও ছিল প্রচুর । তাহাদিগের মধ্যে বেশ নাম করিয়াছিল “মার্‌কশ্যপ”, “গুলতি” ও “মুখোচ্ছবি” নামীয় কতিপয় বেনিয়া গোষ্ঠী।

মার্‌কশ্যপ অতি দীর্ঘকাল ধরিয়া সকলের বাড়িঘর কেমনে চালনা (operate) করিবে তাহার জন্য সুবিধা করিয়া দিয়া আসিতেছিল, এছাড়াও তাহারা বিবিধ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সংস্থা চালাইবার, অর্থাদির হিসাব রাখিবার, সুন্দরভাবে লিখিবার প্রদর্শন করাইবার জন্য বিবিধ উপকরণ তৈয়ার ও বিক্রয় করিয়া আসিয়াছিল । তাহার প্রায় সকল পণ্য অল্প বিস্তর মূল্যে জনতার নিকট বিক্রয় করিত । এসব করিয়া তাহারা যথেষ্ট নাম, যশ ও অর্থ কামায়াছিল।

গুলতি নামক এক যেই বেনিয়াগোষ্ঠী ছিল তাহাদিগের মূল কর্ম ছিল খোঁজাখুঁজি করিয়া দেওয়া । কাহার দোকানে কি রহিয়াছে, কোন স্থানে গেলে কি পাওয়া যাইবে – এইসব তথ্য যেমন গুলতি সবাইকে জানাইত তেমনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন কথা ও তথ্য খুঁজিয়া পাইতেও তাহারা সাহায্য করিত । তাহাদিগের আর ব্যবসা ছিল বিজ্ঞাপন প্রদান ও পুস্তক বিক্রয় । এর ছাড়া তাহারা সবার মধ্যে যোগাযোগ করাইবার বিভিন্ন ব্যবস্থাও করিত।

আর ছিল মুখোচ্ছবি । মার্‌কশ্যপের ও গুলতির চাইতেও অনেক অল্প বয়সের বেনিয়া গোষ্ঠী মুখোচ্ছবি — তাহাদিগের মূল ব্যবসা হইল লোকজনের বন্ধুসকলের হিসাব রাখা। কোন বন্ধু কি করিতেছে, কাহার কি অবস্থা ইত্যাদি মুখোচ্ছবি ব্যবহার করিয়া একে অপরকে জানাইতে পারিত — ছবি, লেখা ইত্যাদি প্রকাশ করিয়া, চিঠিপত্রাদি পাঠাইয়া।

মার্‌কশ্যপ, গুলতি ইহাদেরও পণ্য রহিয়াছে চিঠিপত্র পাঠাইবার, আলোচনা করিবার ইত্যাদি বিবিধ প্রকারের — একের ব্যবসার উন্নতি তাই কখনোবা অপরের ব্যবসার ক্ষতি করিত।

এইরূপ কতিপয় বেনিয়া গোষ্ঠীর বাহিরেও ছিল অনেক ছোট বড় বেনিয়া – যাহারা নানান রকম পণ্য সামগ্রী বানাইয়া প্রভূত নাম কামইতো । কিন্তু অবস্থা এমন হইয়াছিল যে, কিছুকাল অতিবাহিত হইলেই বৃহৎ বণিকগণ অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যবসাসকল কিনিয়া লইয়া নিজ নিজ ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ঘটাইতো।
এইরূপ আরো একবার ঘটিল যখন, গগণবিহারী সাহেব তাহার বিখ্যাত “আকাশপি” নামক ব্যবসাখানা বিক্রয় করিয়া দিতে উদ্যত হইলো।

গগণবিহারী সাহেবের আকাশপি একখানা অতি জনপ্রিয় বস্তু; ইহাতে নানাকিছু করা সম্ভব হইয়া থাকে, যেমন দূরের কাহারো সহিৎ কথা বলা, তাৎক্ষণিক পত্রাদি প্রেরণ এমনকি বহুদূরে যে বা যাহারা বসিয়া রহিয়াছে তাহাদিগের দর্শন লাভও সম্ভবপর হইয়াছে । অকস্মাত গগণবিহারী সাহেব যেইক্ষণে আকশপি বিক্রয় করিতে চাহিল তৎক্ষণাত আসিয়াই তাহা কিনিতে চাহিল দুর্দান্ত প্রতাপশালী গুল্‌তি – বিবিধজনের ব্যবসা কিনিয়া লওয়া যাহার বিশেষ শখ এবং মুখোচ্ছবি – সর্বমানবেরে একই সূত্রে বাঁধিয়া যোগাযোগ করাইয়া দেওয়া যাহার আপ্তবাক্য । এই দুইজনেই চারি নিযুত আস্‌রফি করিয়া ক্রয়মূল্য কহিয়া কিনিবার চেষ্টা চালাইতেছিল । হঠাৎ করিয়াই মার্‌কশ্যপ ঘটনাস্থলে আসিল এবং ভাবিয়া দেখিল যে তাহারা যদি আকাশপি নামক জাদুকরি বস্তু পায় তাহা হইলে মার্‌কশ্যপের বিশেষ উপকার হয় । যেমন, তাহাদিগের ‘জীবন্ত’ নামীয় যে বিশেষ সেবা রহিয়াছে এবং বনেদিগোষ্ঠিদিগকে তাহার যেসব পণ্যসেবা দিয়া থাকে, তাহার সহিৎ এই আকাশপির গুণাগুণ জুড়িয়া দিলে বেশ হয় । ইহা ছাড়া মার্‌কশ্যপের তৈয়ারি খেলিবার যন্ত্র গুননবাক্স ও নাতালের সহিৎ আকাশপি লাগাইয়া দিলে এইসকল পণ্যের ক্রেতাসংখ্যা বহুগুণ বাড়িবে । তাহাদিগের হাতে বহন করা যায় এমন কথা বলিবার যন্ত্র ‘বহমান জানালা’ তেও এই সুবিধা বিশেষ আকর্ষণ আনিবে । সুতরাং মার্‌কশ্যপ অতি উচ্চমূল্য – সাড়ে আষ্ট নিযুত আস্‌রফি দিয়া আকাশপি কিনিয়া লইলো।

অবশেষে দেখা যাইতেছে, কিনিতে না পারিলেও লাভ মুখোচ্ছবি’র-ও হইতেছে । মার্‌কশ্যপ মুখোচ্ছবি-কে বিশেষ স্নেহের দৃষ্টিতে দেখিয়া থাকে এবং তাহারা কারবারিতে অংশীদারও বটে । ফলতঃ দেখা যাইবে যে মুখোচ্ছবি-ও গগণবিহারীর আকাশপি হইতে সুবিধা প্রাপ্ত হইবে।

যাহা হাউক এই বালুকাবেলা নগরের কান্ডকীর্তী বুঝা বড়ই দায় । কি হইতে যে কি হয় আমাদিগের ন্যায় সাধারণ মানুষ যাহারা – তাহাদিগের নাতিদীর্ঘ এন্টিনায় তাহা স্পর্শ করিতে অক্ষম॥

বিঃদ্রঃ এই গল্পের সকল চরিত্র ও স্থান কাল্পনিক; বিশেষ করিয়া আকাশপি, মার্‌কশ্যপ, গুলতি, মুখোচ্ছবি কোনক্রমেই Skype, Microsoft, Google বা Facebook নহে, বালুকাবেলা-ও সিলিকন ভ্যালী নহে। কেহ কষ্ট কল্পনা করিয়া বাস্তব জগতের কোন কিছুর সহিৎ মিল বা সম্পর্ক খুঁজিয়া পাইলে সর্ব-দোষ তাহার