চলতি পাঠ ১

পাঠকসকল! সাধুবচনে বহুকাল পরে আবারো স্বাগতম; আজিকের লেখ্য “চলতি পাঠ” । নামে এই প্রকাশমাধ্যম সাধুবচন, ইহাতে যা লিখিত হয় সকলি সাধুজনের ভাষ্যে বঙ্গীয় ভাষার সাধু রূপে, তাই এই রচনার শিরোনাম চলতি পাঠ হইলেও ইহা চলিত ভাষায় লিখিত হইবে এইরূপ ভাববার অবকাশ নাই । চলিত ভাষা, আরও সঠিকভাবে বলিলে চলিত ভাষার নানারূপে আমরা বাঙালিরা কথা বলিয়া থাকি । একদা প্রমিত সাধু ভাষায়ই সর্বত্র লেখা হইতো, আজিকে ইত্তেফাক নামীয় সংবাদপত্রেও আর সাধুভাষার ব্যবহার প্রত্যক্ষ হয় না ।

পরিতাপের বিষয় এই যে আমরা, বাংলা ভাষাভাষীগণ, সাধুভাষায় আজ আর বিশেষ আরাম অনুভব করি না । সকেলই “ইংলিশ আন্‌ডারস্ট্যান্ড, নো প্রবলেম হ্যাস্‌” আর “উর্দু হিন্দি ভি কাফি আচ্ছা তারিকা সে সামঝতে হ্যায়” কিন্তু বাংলা ভাষার সাধু রূপ দেখিবামাত্র তাহাদিগের নিকট ইহা হিব্রুভাষার ন্যায় প্রতিভাত হয়, যেন ইহা কস্মিনকালেও মানুষের বোধগম্য নহে! যদিওবা এই কালেও হিব্রুভাষার বহুৎসকল ব্যবহারকারী আছেন এবং তাহারাও মানুষও বটেন, তথাপি… । এই নাহয়, গেল লেখ্যরূপ সাধুভাষা – আয়াশে বোধহম্য নহে! আমাদিগের কখনো কখনো বা বাংলাদেশে ব্যবহৃত কিছু কথ্যভাষার রূপ বুঝিতেও সমস্যা হইয়া থাকে। উদাহরণ হিসেবে আসিতে পারে, শ্রীহট্ট তথা সিলেটের ভাষা – যদ্যপি, ইহাকে ঠিক বাংলা ভাষার উপভাষা বলা যায় না, নিজ গুণে ও মহিমায় এই ভাষারূপের রহিয়াছি স্বতন্ত্র রূপ, স্বাদ, গন্ধ, রহিয়াছে নিজস্ব শব্দরাজি, নিজস্ব বাক্যরীতি; তাই ছিলটি ভাষা ভাষাতাত্বিক বিচারে একটি স্বতন্ত্র ভাষার মর্যাদা পায় ও এক কোটির অধিক ভাষাভাষী লইয়া দুনিয়ার ৭৯তম বৃহত্তম ভাষারও মর্যাদা পাইয়া থাকে । উল্লেখ্য যে, প্রাচীন বাংলায় যেকালে বাংলা কি লিপিতে লেখা হইবে তাহার মান নির্ধারিত হয় নাই, তৎকালে সিলটি নাগরী লিপির উদ্ভব হয় ও ষোড়শ হইতে বিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন লোকসাহিত্যের লেখ্য বাহন হিসেবে এই লিপির ব্যবহার হইতে থাকে । সিলটি নাগরী লিপির প্রসার ও ঐতিহাসিক মর্যাদার কারনে উইনিকোডেও এই লিপির স্থান রইয়াছে । সিলটি ভাষার সহিৎ, একইভাবে চাটগাঁইয়া বুলি তথা চট্টগ্রামের কথ্য ভাষার নাম উল্লেখ করিতে হয় । যদিওবা, চাটগাঁইয়া বুলি কেবলি কথ্যভাষা রূপেই ব্যবহৃত হয় ও অতি প্রাচীন কাল হইতেই চট্টগ্রামের সাহিত্যিকগণ বাংলা ভাষাতেই সাহিত্যচর্চা করিয়া আসিয়তেছেন ।

যাহা হৌক, আলোচ্য বিষয় মূলত, চলতি ঘটনা । আজিকাল দেশে ও বিশ্বে অনেক ঘটনাই চলমান আর অনেক ঘটনাই পত্রপত্রিকা, ইন্টারনেট, টিভিচ্যানেলে ভাসমান, দৃশ্যমান, বিবদমান । বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অবশ্যই আজিকে সবচেয়ে আলোচিত ও সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপ্রাপ্ত ঘটনা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচারে লঘু সাজা দান ও তার প্রেক্ষিতে পূর্ণ শাস্তির দাবীতে শাহবাগের মোড়ে প্রতিবাদ সমাবেশ । দশ পনেরজনের থেকে শুরু সেই প্রতিবাদ বিসংবাদ নিমিষেই লাখো মানুষের গণসমাবেশে পরিণত হয়, গনজোয়ারের মতোই; সুখের বিষয় এই সুবিশাল যজ্ঞে কেউ যখন পরিশ্রান্ত হইয়া কিয়দকাল অবসর লইতেছে সেই অবকাশে আরো শত মানুষ জমা হইতেছে; কেউ উপস্থিত না হইতে পারিলে খোমাখাতা তথা ফেসবুক যোগে নিজ নিজ সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করিতেছে, দেশে বিদেশে শাহবাগের মতই আরো অনেক স্থানে একই দাবিতে তাহারা উপস্থিত হইতেছে । এইরূপ আবেগপ্রবণ বাঙালির সার্বজনীন সম্পৃক্ততাপূর্ণ উদ্যোগ কালে কালে দেখা গিয়াছে; এই আবেগের যে মূল চালিকাশক্তি, যে মূল প্রেরণা, যে স্বপ্ন তাহা ধরিয়া রাখিতে হইলে আনাগত ভবিষ্যত লইয়াও সুচিন্তিত উদ্যোগ লইতে হইবে ।

এখন ফাল্গুন মাস, চারিদিকে গাছে গাছে পাতা গজাইতেছে – কিশোরকালের রচনার ন্যায় এই কথা লিখিতে পারিতাম; সমস্যা যা হইতেছে তাহা হইলো চারিপাশে গাছ খুজিয়া পাওয়া দুষ্কর বলিয়াই পাতা গজাইতেছে কি না তা প্রত্যক্ষ করিতে পারিতেছি না । তথাপি, রিকশায় রিকশায়, বোটানিকালে-রমনায়, খাবার রেস্তোঁরায়, আনাচা কানাচে, চিপায় চাপায় আমরা দেখিতে পারিতেছি যুগলবন্দীর মহোৎসব । পহেলা ফাল্গুন বাঙালির ঐতিহ্যবাহী প্রকৃতিপ্রেমী উৎসবে বাসন্তী রঙে ললনাদের সাথে প্রেমপিয়াসী নানা বয়সের সাবালক ঘুরিতে বাহির হইয়া থাকে এই দিনে; আমি এই দিনেও প্রভাতেও বিগত মাঘের সকল সকালের ন্যায় শয্যাত্যাগ করিয়া ক্লান্তিমগ্ন অফিসের কর্মযজ্ঞে দিনাতিপাত করিয়াছি আর দিবসপ্রান্তে একইরূপেই বাসে নিদ্রাযাপন করিতে করিতে গৃহে ফিরিয়া আসিয়াছি । ইহার পরেরদিন, ২রা ফাল্গুন – গিফট ব্যবাসয়ীদের প্রচারে বিশেষ প্রসারপ্রাপ্ত ভ্যালেন্টাইন দিবস বা ভালোবাসা দিবস উদযাপিত হয় । এইদিনে বিশেষ পাওনা, কপোত-কপোতীর ঝাপাঝাপির দরূন রাস্তায় জ্যামের আধিক্য আর হৃদয়ে-হৃদয়ে টানাটানি প্রকাশের চাপে পিষ্ট হইয়া পুষ্পরাজির অকাল মরণ; পুষ্পসকলের এই মরণে হাত পা ফুলিয়া কলাগাছ, তালগাছ, বটগাছ হইয়াছে অনেক ফুলব্যবসায়ীর । যে গোলাপ ৫ টাকায় বিকোতে চায়না, এইদিনে তাহাই পঞ্চাশ টাকায় পাইলে ক্রেতাগণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, কে লইবে সে গোলাপ, প্রেয়সীকে দেবার প্রত্যাশায় । ফাল্গুন – চৈত্র দুমাসকেই পঞ্জিকায় বসন্ত বলা হইলেও প্রকৃত বসন্ত যেন কেবলই এই ফাল্গুন । এই একমাসেই তাই বাঙালির মাঝে প্রেম, পিরিতী, পরিণয় বাড়াবাড়ি রকম বাড়িয়া যায় । খোমাখাতায় বন্ধুবান্ধবের সখীবন্ধন আর প্রেমের আলাপন বহুগুণে টাইমলাইনে আর হোমপেজে দৃষ্ট হইতে থাকে । পাশাপাশি পরিণয় অনুষ্ঠানাদিও পাড়ায় পাড়ায় বড় বেশি করে চক্ষুগোচর হইতে থাকে । কার্ত্তিকে অনেক প্রাণীর যুগলবন্ধনের তোড় বাড়িয়া থাকে । প্রকারান্তরে, সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের কামনার সময় এই বসন্তেই আসিয়া থাকে । এইকালে, কোন কোন একাকী তরুণের আর তরুণীর পুষ্পহীন বসন্ত কাটিতে থাকে অনেকের পুষ্পসমাহারে জর্জরিত বিয়ের আসর আর প্রেমের পসরা দেখিতে দেখিতে; এক ফাল্গুন তাহাদের শেষ হয় পুষ্পহীন আরেকটি ফাল্গুন না আসিবার কামনায় । অন্যদিকে, নির্দয় পরিহাস ও প্রকৃতি তাহাদের জন্য আরো একখানা পুষ্পহীন ফাল্গুন প্রস্তুত করিতে ব্যস্ত হইয়া পরে ।

Advertisements