শুদ্ধ কহ বঙ্গভাষা, হে বঙ্গজন

বঙ্গভাষা/বাঙ্গালাভাষা/বাংলা ভাষা — আমার প্রাণের ভাষা, মুখের ভাষা, মনের ভাষা, বন্ধুর সহিৎ কথা কইবার ভাষা, শত্রুকের গালাগাল করিবার ভাষা, লিখিবার ভাষা, গান গাহিবার ভাষা, আনন্দ বেদনার অশ্রুর ভাষা । হৃদয় নিঙরানো অভিব্যক্তির প্রকাশ যেমন বাংলা ভাষায় করি তেমনি মনে মনে অবিরল ভাবি এই বাংলাভাষাতেই । এইরূপে বাংলা ভাষা আমাদিগের জীবনের অংশ হইয়া গিয়াছে । তথাপি, বাংলাদেশে কেহ কেহ বাংলা ভাষা লইয়া ঠিক গর্ব করিতে পারে নাই; যাহারা পারে নাই, তাহাদের বিষয়ে কবি লিখিয়াছেন, “যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী ।\ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি ॥

আজিকে বাংলায় চারিদিকে অজানা অচেনা কতিপয় ভাষা শুনিতে পাই, বাঙালির মুখে বোল তোলা এ ভাষা বাংলা নহে; তবে তাহা হিন্দি বা ইংরেজিও নহে — এসকল এক জারজ শংকর ভাষার ন্যায়ই প্রতিভাত হয় । ভাষার নানান রূপ থাকিবে, ঠিক যেমনই এক মায়ের অনেক সন্তান থাকে । বাঙলা ভাষার রহিয়াছে তিনটি মান রূপঃ (১) বলিবার মান্য চলিত কথ্য ভাষা (২) লিখিবার মান্য চলিত লেখ্য ভাষা (৩) পূর্বে ব্যবহৃত লিখিবার সাধু ভাষা । লিখিবার ও বলিবার মান চলিত ভাষা আদতে ও প্রথমে একইরূপ ছিল, কিন্তু বলিবার ভাষা হইতে লিখিবার ভাষা অধিক পরিশিলীত ও লিখিবার চাইতে বলিবার ভাষা অধিক সাবলীল বিধায় প্রয়োগ ক্ষেত্রে মান্য চলিত ভাষা লিখিতে ও বলিতে কিছুটা ভিন্নরূপ শ্রুত ও পঠিত হয় বটে । আর লিখিবার জন্য সাধু ভাষা, যা কিনা বড়ই সুমধুর ও সুমিষ্ট কিন্তু ঠিক ততোটা সাবলীল নহে তাহার ক্রিয়ারূপ ও ব্যবহারের আমেজ কিছু ভিন্ন । আজো দলিলে নথিতে সাধু ভাষা লিখিত হইলেও মূলত ইহার প্রয়োগ নাই বলিলেও চলে, বিগত দশকে ইত্তেফাক পত্রিকা সাধুভাষার পরিবর্তে চলিত ভাষায় লেখা প্রকাশ করিতে শুরু করিলে সাধুভাষা প্রায় হারাইয়া যায় । এই তিন মান ভাষা ছাড়াও রহিয়াছে প্রতিটি অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা, যেমন ময়মনসিংহ জেলা ভাষা, কুষ্টিয়া জেলা হইতে অনেক আলাদা – এইসব আঞ্চলিক ভাষা বহুকাল ধরিয়া গড়িয়া উঠে বিধায় এসকল বাংলা ভাষার সম্পদ । এছাড়াও, ঢাকা শহরের নতুন অধিবাসীগণ – যাহারা বিভিন্ন অঞ্চল হইতে আসিয়াছে তাহারা সকলে একটি বিশেষ রূপে কথা কহেন । একই বিশ্ববিদ্যালয়ে বা পাঠতীর্থেও ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থী থাকে বিধায় সেখানে কথায় বেশ কিছু ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় ।

এইসকল ঠিক ছিল, উপরন্তু বাংলার এই নানারূপ ব্যবহার ভাষাকে সমৃদ্ধ করিয়াই চলিতেছিল; কিন্তু গোল বাঁধিল তখনি যখন কতিপয় পেশার লোক কৃত্রিম কিছু বাংলা ভাষার রূপ আমদানি করিতে থাকিলেন । নতুন কিছু বেসরকারী বেতার মাধ্যমে আরজে বা রেডিও জকি নামে পরিচিত পেশাজীবি নবশিক্ষিত যুবক উত্তরাধুনিক বাংলা ভাষার যে রূপ লইয়া আসে তাহাতে শোনা যায়, আজগুবি উচ্চারণে ইংরেজি উর্দু শব্দে ঠাসা বাংলা ভাষা, যা শুনিলে আমাদিগের মনে হইতে থাকে, কেহ কথকের গলা চাপিয়া ধরিয়াছে ও পশ্চাৎদেশে প্রবল বেগে আঘাত করিতেছে – সেই আঘাতের তালে তাল করিয়া কথক দ্রুত ইংরেজের ন্যায় উচ্চারণে কহিতে থাকে । কোন এক অদ্ভুদ কারণে, বাংলা অভিধানের সুন্দর সুন্দর শব্দ বাদ দিয়া তাহারা ইংরেজি শব্দ ভুলভাবে ব্যবহার করিতে থাকে; কখনো কতিপয় ইংরেজি শব্দ তাহারা এমনেতর অর্থে ব্যবহার করে যাহা খাস ইংরেজেরও অজানা ছিল, আর সেসকল শব্দের উচ্চারণ না হয় ইংরেজের ন্যয় না বাঙালির ন্যায় । একইরূপ উচ্চারণ ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত হয়, নব্য আধুনিক অনেক পেশাজীবি, যাহারা কিছুটা চিবিয়ে বাংলা না বলিলে ঠিক স্মার্ট হওয়া যায় না বলিয়া মনে করে ।
বিশেষ দুঃখের কারণ হইয়া দাঁড়ায় যখন দেখা যায়, বিভিন্ন উচ্চশিক্ষিত লোকজন বাংলায় কথা বলিবার সময় প্রচুর পরিমাণ ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করিতেছে, তাহাদের বাংলা উচ্চারণ উত্তম ও সুন্দর হইলেও বিভিন্ন কথা বলিবার সময় কোন এক কারণে তাঁহারা বাংলা শব্দ খুঁজে পাইবার আগেই ইংরেজি শব্দ ঠোঁটের আগায় চলিয়া আসে; এই শ্রেণীর ব্যক্তিসকল পূর্বে উল্লেখিত শ্রেণীদ্বয়ের ন্যয় ইচ্ছাকৃত ইংরেজি শব্দের বাহার লইয়া বসে না, বরং বাংলা সেসকল শব্দের নিয়মিত ব্যবহার না করিবার কারণেই বাংলা ব্যবহার করিতে ভুলিয়া যায় । এর কারন হিসেবে বলা চলে, বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক, পত্রিকা, নথি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ সকলই ইংরেজিতে পঠিত হয়; হয়তোবা দেশে বিদেশে সেমিনার সকলে লিখন ও পঠণ সকল রচনাই হয় ইংরেজিতে; তাই মস্তিষ্কে ইংরেজি শব্দগুলোই এসকল ধারণার সাথে সরাসরি গাঁথিয়া যায় – মাতৃভাষা বাংলার শব্দই উল্টো যেন অনুবাদ করিয়া স্মরণে আনিতে হয় । এই অসুবিধা ও অনভ্যাস দূর করিতে আসলে আমাদিগের উচিৎ হইবে, বাংলায় পাঠ্যাভ্যাস বৃদ্ধি করা, বিভিন্ন পাঠ্য ও গুরুত্বপূর্ণ মননশীল বই ও জ্ঞানগ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করিয়া বাংলায় পাঠের ব্যবস্থা করা । আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পত্রিকাদির দেশীয় সংস্করণ করিলে তাহা ঠাঁট বজায় রাখিবার তালে ইংরেজিতেই না করিয়া বাংলায় প্রকাশ করা ।

শিশুসকল, কিশোরেরা, ভবিষ্যতের যে প্রজন্ম তার এক বড় অংশ ভাষা শিখিতেছে আজব উপায়ে; কেহ কেহ ঠাঁট ও ভাব বজাইতে গিয়া ইংরেজি মাধ্যমে পড়িতেছে, কেহবা দেশীয় পাঠ নিচ্ছে ইংরেজি ভাষায়, আর যাহারা বাংলাতেই দেশীয় পাঠ নিচ্ছে, তাহারাও নিত্য দেখছে হিন্দি টিভি অনুষ্ঠান – চলচ্চিত্র , শুনিতেছেও হিন্দি গান । তাহারা বাংলায় কথা না বলিয়া তাই হিন্দিতে পারদর্শী হইয়া উঠিতেছে । আরও মজা হইতেছে, যখন আমরা কোন পাকি বা ইন্ডির সাথে সাক্ষাৎ পাই, তখন বাংলা ছাড়িয়া হিন্দি-উর্দু মিশাইয়া কথা কহি; ইংরেজি ব্যবহার করিলেও নাহয় হইতো — আসলে আমাদিগের ভাষাকে মর্যাদাই দিতে চাহি নাই আমরা!

এই যে বাংলা ভাষার নানারূপ লইয়া আর ইহার দূষণ লইয়া এত কথা লিখিলাম, তাহার কারণ মূলত আজিকে প্রাতে পঠিত সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের রচিত এক নিবন্ধ যাহা দৈনিক প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয়তে ‘ভাষা দূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী’ শিরোনামে প্রকাশ হয় । এরই রেশ ধরিয়া উচ্চ আদালত বেতার টিভিতে ভুল উচ্চারণে বাংলা কহিতে নিষেধ করিয়া এক নির্দেশ দেন । এই নির্দেশেই বাংলা ভাষার ভুল ব্যবহার বন্ধ হইয়া যাইবে না; তবে ইহাতে জোর আলোচনা হইবে কিছুকাল, যা কিছুটা হইলেও আমাদিগের সকলের চেতনা কিছুকালের জন্য হইলেও জাগ্রত করিবে – আমরা অনেকেই ভুল বুঝিতে পারিয়া সঠিকভাবে আমাদের এই প্রিয় বাংলা ভাষা ব্যবহারে উদ্যত হইবো ।

আর শুধু ফেব্রুয়ারিকে ভাষার মাস, এসময়ই কেবল “ভাষা ভাষা” করিতে হইবে এমন ধারণা হইতে বাহির হইয়া, বাংলা ভাষাকে সত্যই প্রাণে ধারণ করিলে বৎসরের প্রতিদিনই সুন্দরভাবে সঠিক বাংলা বলিতে ও লিখিতে সচেষ্ট হইতে হইবে ।

Advertisements