নোবেলালাপ ২০১৪

দুনিয়ার তাবৎ মানুষেরই দিলে বোধকরি নোবেল নামক পুরষ্কারটি পাইবার লুকায়িত খায়েশ রইয়াছে । এইটি আসলেই একখানা খুবই আকর্ষনীয় ও সম্মানের প্রাপ্তি । তবে ইহা বোগলদাবা করা ঠিক সহজ কোন কর্ম নয় ।

পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসা বা রসায়নে ইহার অর্জন করিতে যারপরনাই খাটুনি ও মেধার খরচ করিতে হয় । সাহিত্যের ব্যাপারটি আমার ঠিক বোধে আসে না । বিজ্ঞানের গুণনত মাণ একই মাপকাঠিতে মাপা গেলেও দুনিয়ার তাবৎ ভাষার সকল সাহিত্য কিরূপে পাশাপাশি মাপা যাইতে পারে? অর্থনীতিতে নোবেলের সম্মানে যেই পুরষ্কারটি দেয়া হয় তাহাও সহজ কম্ম নয় ।

পুরষ্কার হিসেবে নোবেলকে সর্বোচ্চ সম্মানের ধরা হয় । কিন্তু এইটে জ্ঞানের সব বিভাগের জন্য প্রচলিত নয়; এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে অবদানের জন্য নয় বরং মানবকল্যানে প্রত্যক্ষ অবদান রাখিবার জন্যই এইটি দেয়া যায় । অথচ, বিজ্ঞানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রত্যক্ষ মূল্যায়ন তাৎক্ষণিক হয় না । একারনেই, আইনস্টাইনের সবচে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব নিয়ে হইলেও তাঁহাকে পুরুষ্কৃত করা হইয়াছে ফটোইলেক্ট্রিক ইফেক্টের জন্য । অনেক ব্যাক্তি আছেন, যাহাদের কর্ম অনেক গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও নোবেল দিয়ে তাঁহাদিগকে সম্মানিত করা যায় নি ।
তবে, বিভিন্ন শাখায় নোবলের ন্যায় সর্বোচ্চ সম্মানের আর কিছু পুরষ্কার প্রচলিত আছে । যথাঃ- ট্যুরিং অ্যাওয়ার্ড, ফিল্ড্‌স মেডেল ইত্যাদি ।

যাহা হৌক, শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তি নিয়ে সবসময়ই সকলেই নানাবোধ প্রশ্ন করিয়া আসিয়াছে । অনেকেই ইহাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার ও কৌশলের অংশ বলিয়া মনে করিয়া থাকে ।

বাঙালির পরশ্রীকাতরতা নতুন নয় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য নোবেল লাভকে প্রশ্ন করিয়া অনেকে কহে, ‘নজরুল কেন পাইল না’! ইহা সঠিক যে, রবি ঠাকুর পাইলে নজরুলও পাইবার যোগ্য; আমার মতে হুমায়ূন আহমেদও । কিন্তু সকল যোগ্য ব্যক্তিই আসলে পুরুষ্কারটি পান না; কিন্তু যাহারা পাইছেন তাহারা কিন্তু কম শ্রদ্ধেয় নন, কম যোগ্যতার নন । কয়েক বৎসর পূর্বে, ব্যাংকার ড. মুঃ ইউনুস শান্তিতে নোবেল পাইলে বাঙালি তাঁহাকে সম্মাননা জানানো দূরে থাক, বরং তাহাকে নাস্তানাবুদ করিতে ছাড়ে নাই । মালালা নোবেল পাওয়াতে সকলেরই চোখ টাঁটাইবে, এতে আর সন্দেহ কী?

তবে আমার কথা হইল, গালমন্দ না করিলেই নয় কি? আপনি তো এমনিতেই শান্তিতে নোবেলকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না ।

পরিশেষে বলিবঃ বাঙালির প্রতিবছরই “অশান্তিতে কদবেল” মেডেল লাভ করা উচিৎ ।

Advertisements

চলতি পাঠ – ২

কিছুকাল যাবৎ মন বিশেষ ভালো নহে । গেল বৎসর শরতে, চাকুরি ছাড়িয়া উচ্চতর ডিগ্রি লাভের আশায় স্বদেশ ছাড়িয়া পশ্চিমা মুলুকে আসিয়াছি; প্রথম প্রথম নূতন নূতন সকলি ভালো লাগিতেছিল । কিন্তু দিনে দিনে যেন দেশ হইতে দূরত্ব কেবলি বাড়িতে থাকিল আর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজনের নৈকট্যলাভের সাধ জ্যামিতিক হারে বাড়িতেই থাকিল । গত দু-তিন সপ্তাহে মিডটার্ম চলিতেছে, অর্থাৎ পরীক্ষা চলিতেছে; পরীক্ষা জীবনে কোনকালেই মনপূত হয় না – তবে পরীক্ষা লইয়া অনুযোগ আর বিরাগ হওয়াও আমার স্বভাব নহে । কিন্তু, বাঁধ সাধিতেছে বন্ধুত্বের অভাব । যেকালে, কুয়েটে পড়িতাম সেকালে চারিদিকে বাস করিত নানাবর্ণের বন্ধুবান্ধব, এখন তাহা নাই । গোটা স্টোনিব্রুকে (আমার যেখানে বাস ও পাঠ) বাংলাদেশি স্নাতক শিক্ষার্থী আছি আমরা হাত গুণতি বারো তের জন । শিক্ষাজীবনেই কহ আর চাকুরি জীবনেই কহ, আড্ডাবাজি আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে । দেশ, কাল, জাতি, খেলা ইত্যাদি লইয়া মন খুলিয়া আড্ডাবাজি করাটাই আমার জীবনের লক্ষ্য বলিয়ে প্রতিভাত হইত ।

যাহা হৌক, কিছুকাল ধরিয়া দেশ, জাতি, ক্রীড়া ইত্যাদি লইয়া নানাকিছুই আমাকে সম্যক পীড়া দিতেছে । দেশ লইয়া হতাশা ব্যক্ত করিতে কাহারো ভালো লাগে না, আমার তো নহেই । তবুও, দেশের কতিপয় নয় বরং অনেক কিছু লইয়াই আমি চিন্তিত । আজিকে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণার ৪৩ বর্ষ পূর্ণ করিতে যাইতেছে । আমি যখন বৈদেশে আসি, সেকালে দেশে চূড়ান্ত রাজনৈতিক অস্থিরতা চলিতেছিল; এই বৎসরের শুরুতে তাহা স্তিমিত হইলেও সমস্যা যাহা ছিল তাহার কোন সমাধান সাধিত হয় নাই । দেশের প্রধান বিরোধী দল, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নাই; আজিকাল ফেসবুক ব্যাতীত আর কোথাও তাহাদের এমনকি চিহ্নও খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না । দেশে, একই দল, পরপর দুই সংসদে সরকার গঠণ করিয়াছে, দেশের উন্নতি, প্রগতির ধারা ধরিয়া রাখিবার জন্য ইহা খুবই সহায়ক । চিন্তিত হইতেছি ইহা ভাবিয়া, যে দেশে যে সংসদ সরকার গঠন করিল তাহা তেমন কোন ভোটই অর্জন করিল না; এবং তাহা লইয়া জনগণের তেমন কোন উচ্চবাচ্য নাই । ইহাতে, একটি জিনিসই প্রতীয়মান হয়, আর তাহা হইল, আমরা যতই দেশ দেশ করিয়া থাকি না কেন, আদতে জাতি হিসেবে আমরা দেশসচেতন নহ । দেশের সরকার কি করিবে তাহা লইয়া আমরা কালেভদ্রে ম্যাৎকার করিলেও আসলে দেশ লইয়া আমাদিগের তেমন কোন পরোয়া নাই । চারদশক পার করিয়া আমরা একটি দেশে বসবাস করিতেছি, যাহাতে গণতন্ত্র ঠিকমত প্রতিষ্ঠা পায় নাই । ইহা মানিয়া লইলাম; কিন্তু পীড়িত হই তখন, যখন দেখি আমাদিগের অর্থনৈতিক কাঠামো খুবই পর্যদুস্ত । আমাদিগের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যাহাকিছু আছে সকলি ভোগকেন্দ্রিক, উৎপাদন কেন্দ্রিক নহে । শুধু তাই নহে, দেশের অবস্থাও খুব বিনিয়োগবান্ধব নহে । উৎপাদন না হইলে দেশের সম্পদ কেবলি কমিতে থাকিবে আর দেশের উন্নতি ধূসর থেকে ধূসরতর স্বপ্নে পরিণত হইতে থাকিবে ।

দেশ লইয়া বিশেষ আমোদিত হইতে পারিতেছি না বলিয়া কিয়দকাল ধরিয়া ক্রিকেট ম্যাচসমূহ দেখিতেছি, যদি তাহাতে কিছু আনন্দলাভ হয় । কিন্তু তাহাতেও বিধিবাম । প্রথম এশিয়া কাপে, কোন ম্যাচ জিতিতে পারিলাম না, এমনকি সহজসাধ্য আফগানিস্তানের নিকটও হারিয়া টুর্নামেন্টে কোন ম্যাচ না জিতিবার অসাধারণ রেকর্ড গড়িলাম । ভাবিলাম, যাহা হৌক এই টুর্ণামেন্ট হইতে শিক্ষা লইয়া টি২০ তে ভালো করিব । সেক্ষেত্রেও আবারো হংকং এর নিকট পরাজিত হইয়া, কোয়ালিফাইং রাউন্ড খেলিবার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করিয়া কোনরকমে মূল রাউন্ডে উঠিলাম বটে; প্রথম ম্যাচে আজিকে যাহা খেলিলাম তাহাতে মন বিষাদগ্রস্ত না হইবার কোন কারন খুঁজিয়া পাই না । দেশে থাকিলে, কতিপয় বন্ধুবান্ধব লইয়া কিয়দক্ষণ মাতম করিতাম – এইখানে তাহা হইলো না ।

চলতি কথন যেহেতু লিখিতেছি, চলতি আলোচ্য জাতীয় সঙ্গীতের রেকর্ড লইয়াও কিছু কথা উল্লেখ না করিলেই নহে । ছোটকালে যখন স্কুলে যাইতাম, আর প্রতিদিন প্রাতে শ্যামল ঘাষের মোলায়েম মাঠে “আমার সোনার বাংলা” গাহিয়া উঠিতাম, আর সকলের সুরের মধ্যে আমার সুরহীন গীতি হারাইয়া যাইত, আর সঙ্গীতের অনাবিল সুরে মনখানা নাচিয়া উঠিত । কিন্তু, লক্ষ মানুষ একত্রিত হইয়া গাহিলে কী এমন লাভ সাধিত হইবে, এবং তাহা করিতে কেন অর্ধশতাধিক কোটি টাকা খরচ হইবে তাহ বুঝিতে পারি না । আয়োজনের নানাবিধ সমস্যা আর দেশপ্রেমের চাকচিক্যসার প্রদর্শণ লইয়া দেশের মানুষের নানাবিধ আপত্তি ও আলোচনায় চাপা পরিয়া জাতীয় সঙ্গীত সম্ভ্রম হারাইতেছে । মনখুলিয়া গান গাইবার যে আত্মপ্রসাদ তাহার বানিজ্যিকরণের এই বোধকরি সমস্যা ।

কিয়দকাল পূর্বে মালয়শিয়ান এয়ারের একখানা বিমান হারাইয়া গেল । ইহার সন্ধান নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত জনমনের ন্যায় আমারও প্রশ্ন ছিল বিমানখানি গেল কোথা’! । গতকাল যখন শুনিলাম ইহা ভারত মহাসাগরে বিলীন হইয়াছে, প্রথমবারের মত মনে হইল, কয়েকশত মানুষ মারা গিয়াছে ও তাহাদিগের সলিল সমাধি হইয়াছে । সকলের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করিতেছি । আমার জানামতে, কোন পরিচিতজনের আত্মীয় তাহাদিগের মধ্যে ছিল না । কিন্তু আমাদিগের পরিচিতজন কেহ থাকিতেও পারিত ।

সকলকে মহান স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা ও এই দিবস উপলক্ষ্যে দেশের সর্বোত মঙ্গল কামনা করিয়া আজিকার মতন ইতি টানিতেছি ।

চলতি পাঠ ১

পাঠকসকল! সাধুবচনে বহুকাল পরে আবারো স্বাগতম; আজিকের লেখ্য “চলতি পাঠ” । নামে এই প্রকাশমাধ্যম সাধুবচন, ইহাতে যা লিখিত হয় সকলি সাধুজনের ভাষ্যে বঙ্গীয় ভাষার সাধু রূপে, তাই এই রচনার শিরোনাম চলতি পাঠ হইলেও ইহা চলিত ভাষায় লিখিত হইবে এইরূপ ভাববার অবকাশ নাই । চলিত ভাষা, আরও সঠিকভাবে বলিলে চলিত ভাষার নানারূপে আমরা বাঙালিরা কথা বলিয়া থাকি । একদা প্রমিত সাধু ভাষায়ই সর্বত্র লেখা হইতো, আজিকে ইত্তেফাক নামীয় সংবাদপত্রেও আর সাধুভাষার ব্যবহার প্রত্যক্ষ হয় না ।

পরিতাপের বিষয় এই যে আমরা, বাংলা ভাষাভাষীগণ, সাধুভাষায় আজ আর বিশেষ আরাম অনুভব করি না । সকেলই “ইংলিশ আন্‌ডারস্ট্যান্ড, নো প্রবলেম হ্যাস্‌” আর “উর্দু হিন্দি ভি কাফি আচ্ছা তারিকা সে সামঝতে হ্যায়” কিন্তু বাংলা ভাষার সাধু রূপ দেখিবামাত্র তাহাদিগের নিকট ইহা হিব্রুভাষার ন্যায় প্রতিভাত হয়, যেন ইহা কস্মিনকালেও মানুষের বোধগম্য নহে! যদিওবা এই কালেও হিব্রুভাষার বহুৎসকল ব্যবহারকারী আছেন এবং তাহারাও মানুষও বটেন, তথাপি… । এই নাহয়, গেল লেখ্যরূপ সাধুভাষা – আয়াশে বোধহম্য নহে! আমাদিগের কখনো কখনো বা বাংলাদেশে ব্যবহৃত কিছু কথ্যভাষার রূপ বুঝিতেও সমস্যা হইয়া থাকে। উদাহরণ হিসেবে আসিতে পারে, শ্রীহট্ট তথা সিলেটের ভাষা – যদ্যপি, ইহাকে ঠিক বাংলা ভাষার উপভাষা বলা যায় না, নিজ গুণে ও মহিমায় এই ভাষারূপের রহিয়াছি স্বতন্ত্র রূপ, স্বাদ, গন্ধ, রহিয়াছে নিজস্ব শব্দরাজি, নিজস্ব বাক্যরীতি; তাই ছিলটি ভাষা ভাষাতাত্বিক বিচারে একটি স্বতন্ত্র ভাষার মর্যাদা পায় ও এক কোটির অধিক ভাষাভাষী লইয়া দুনিয়ার ৭৯তম বৃহত্তম ভাষারও মর্যাদা পাইয়া থাকে । উল্লেখ্য যে, প্রাচীন বাংলায় যেকালে বাংলা কি লিপিতে লেখা হইবে তাহার মান নির্ধারিত হয় নাই, তৎকালে সিলটি নাগরী লিপির উদ্ভব হয় ও ষোড়শ হইতে বিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন লোকসাহিত্যের লেখ্য বাহন হিসেবে এই লিপির ব্যবহার হইতে থাকে । সিলটি নাগরী লিপির প্রসার ও ঐতিহাসিক মর্যাদার কারনে উইনিকোডেও এই লিপির স্থান রইয়াছে । সিলটি ভাষার সহিৎ, একইভাবে চাটগাঁইয়া বুলি তথা চট্টগ্রামের কথ্য ভাষার নাম উল্লেখ করিতে হয় । যদিওবা, চাটগাঁইয়া বুলি কেবলি কথ্যভাষা রূপেই ব্যবহৃত হয় ও অতি প্রাচীন কাল হইতেই চট্টগ্রামের সাহিত্যিকগণ বাংলা ভাষাতেই সাহিত্যচর্চা করিয়া আসিয়তেছেন ।

যাহা হৌক, আলোচ্য বিষয় মূলত, চলতি ঘটনা । আজিকাল দেশে ও বিশ্বে অনেক ঘটনাই চলমান আর অনেক ঘটনাই পত্রপত্রিকা, ইন্টারনেট, টিভিচ্যানেলে ভাসমান, দৃশ্যমান, বিবদমান । বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অবশ্যই আজিকে সবচেয়ে আলোচিত ও সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপ্রাপ্ত ঘটনা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচারে লঘু সাজা দান ও তার প্রেক্ষিতে পূর্ণ শাস্তির দাবীতে শাহবাগের মোড়ে প্রতিবাদ সমাবেশ । দশ পনেরজনের থেকে শুরু সেই প্রতিবাদ বিসংবাদ নিমিষেই লাখো মানুষের গণসমাবেশে পরিণত হয়, গনজোয়ারের মতোই; সুখের বিষয় এই সুবিশাল যজ্ঞে কেউ যখন পরিশ্রান্ত হইয়া কিয়দকাল অবসর লইতেছে সেই অবকাশে আরো শত মানুষ জমা হইতেছে; কেউ উপস্থিত না হইতে পারিলে খোমাখাতা তথা ফেসবুক যোগে নিজ নিজ সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করিতেছে, দেশে বিদেশে শাহবাগের মতই আরো অনেক স্থানে একই দাবিতে তাহারা উপস্থিত হইতেছে । এইরূপ আবেগপ্রবণ বাঙালির সার্বজনীন সম্পৃক্ততাপূর্ণ উদ্যোগ কালে কালে দেখা গিয়াছে; এই আবেগের যে মূল চালিকাশক্তি, যে মূল প্রেরণা, যে স্বপ্ন তাহা ধরিয়া রাখিতে হইলে আনাগত ভবিষ্যত লইয়াও সুচিন্তিত উদ্যোগ লইতে হইবে ।

এখন ফাল্গুন মাস, চারিদিকে গাছে গাছে পাতা গজাইতেছে – কিশোরকালের রচনার ন্যায় এই কথা লিখিতে পারিতাম; সমস্যা যা হইতেছে তাহা হইলো চারিপাশে গাছ খুজিয়া পাওয়া দুষ্কর বলিয়াই পাতা গজাইতেছে কি না তা প্রত্যক্ষ করিতে পারিতেছি না । তথাপি, রিকশায় রিকশায়, বোটানিকালে-রমনায়, খাবার রেস্তোঁরায়, আনাচা কানাচে, চিপায় চাপায় আমরা দেখিতে পারিতেছি যুগলবন্দীর মহোৎসব । পহেলা ফাল্গুন বাঙালির ঐতিহ্যবাহী প্রকৃতিপ্রেমী উৎসবে বাসন্তী রঙে ললনাদের সাথে প্রেমপিয়াসী নানা বয়সের সাবালক ঘুরিতে বাহির হইয়া থাকে এই দিনে; আমি এই দিনেও প্রভাতেও বিগত মাঘের সকল সকালের ন্যায় শয্যাত্যাগ করিয়া ক্লান্তিমগ্ন অফিসের কর্মযজ্ঞে দিনাতিপাত করিয়াছি আর দিবসপ্রান্তে একইরূপেই বাসে নিদ্রাযাপন করিতে করিতে গৃহে ফিরিয়া আসিয়াছি । ইহার পরেরদিন, ২রা ফাল্গুন – গিফট ব্যবাসয়ীদের প্রচারে বিশেষ প্রসারপ্রাপ্ত ভ্যালেন্টাইন দিবস বা ভালোবাসা দিবস উদযাপিত হয় । এইদিনে বিশেষ পাওনা, কপোত-কপোতীর ঝাপাঝাপির দরূন রাস্তায় জ্যামের আধিক্য আর হৃদয়ে-হৃদয়ে টানাটানি প্রকাশের চাপে পিষ্ট হইয়া পুষ্পরাজির অকাল মরণ; পুষ্পসকলের এই মরণে হাত পা ফুলিয়া কলাগাছ, তালগাছ, বটগাছ হইয়াছে অনেক ফুলব্যবসায়ীর । যে গোলাপ ৫ টাকায় বিকোতে চায়না, এইদিনে তাহাই পঞ্চাশ টাকায় পাইলে ক্রেতাগণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, কে লইবে সে গোলাপ, প্রেয়সীকে দেবার প্রত্যাশায় । ফাল্গুন – চৈত্র দুমাসকেই পঞ্জিকায় বসন্ত বলা হইলেও প্রকৃত বসন্ত যেন কেবলই এই ফাল্গুন । এই একমাসেই তাই বাঙালির মাঝে প্রেম, পিরিতী, পরিণয় বাড়াবাড়ি রকম বাড়িয়া যায় । খোমাখাতায় বন্ধুবান্ধবের সখীবন্ধন আর প্রেমের আলাপন বহুগুণে টাইমলাইনে আর হোমপেজে দৃষ্ট হইতে থাকে । পাশাপাশি পরিণয় অনুষ্ঠানাদিও পাড়ায় পাড়ায় বড় বেশি করে চক্ষুগোচর হইতে থাকে । কার্ত্তিকে অনেক প্রাণীর যুগলবন্ধনের তোড় বাড়িয়া থাকে । প্রকারান্তরে, সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের কামনার সময় এই বসন্তেই আসিয়া থাকে । এইকালে, কোন কোন একাকী তরুণের আর তরুণীর পুষ্পহীন বসন্ত কাটিতে থাকে অনেকের পুষ্পসমাহারে জর্জরিত বিয়ের আসর আর প্রেমের পসরা দেখিতে দেখিতে; এক ফাল্গুন তাহাদের শেষ হয় পুষ্পহীন আরেকটি ফাল্গুন না আসিবার কামনায় । অন্যদিকে, নির্দয় পরিহাস ও প্রকৃতি তাহাদের জন্য আরো একখানা পুষ্পহীন ফাল্গুন প্রস্তুত করিতে ব্যস্ত হইয়া পরে ।

বিদ্যালোভে বিদ্যানাশে, বিদ্যা নাহি লভে

পূর্বে ভাবিতাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ করিবার উদ্যেশ্য বুঝিবা জ্ঞান অর্জন, বিদ্যালাভ ও বিশ্বকে উদার নয়নে দেখিবার পথনির্দেশ লাভ – ইহাতে ঐহিক বা পারত্রিক লাভ মুখ্য নহে বরং আত্মিক উন্নয়ন সাধন ও মানসিক সৌকর্য অর্জন-ই বিধেয় । কিন্তু আজ জানিলাম ভিন্নতর; ছেলেমেয়ে মিলিয়া বিগলিত চিত্তে হরদম ঘুরিয়া বেড়ানো, শহরের আনাচে কানাচে, গলিতে ঘুপচিতে, রাস্তায় ময়দানে যখন যেখানে সম্ভব উদ্যাম আনন্দে মাতিয়া ওঠাই যেনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মোকশো । আরও জানিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ করিয়াই সাফল্যের দুয়ারে পৌঁছানো যায়, যে সাফল্যের অর্থ দামি গাড়ি ক্রয়। আসলেই আজ মনে হইতেছে বিশ্ববিদ্যালয় হইলো গাড়ি-বাড়ি-নারী লাভের শষ্যক্ষেত্র, নিতান্তই মূল্যহীন কিছু জ্ঞানের জন্য আর যাই হৌক কেহ তো পয়সা খরচ করিতে আসিবে না ।

এককালে জানিতাম, অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ এসকল নামীদামী পাঠকেন্দ্রে বিদ্যার্থীর সমাগম হতো; সেসব বিদ্যার্থীর মোকশো ছিলো না বাড়ি গাড়ি অর্জন; ছিলোনা বাহারি জীবনের স্বপ্ন । তাহারা জানিত বিশ্ববিদ্যালয় মানে হইলো অনেকটা খাটুনি আর কতোটুকু কষ্টের মাধ্যমে জ্ঞানগুরুর দেখানো পথে চলিতে শেখা । সেসকল বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখাদেখি দুনিয়ার তাবৎ স্থানে একসময় নানা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়িয়া ওঠিতে থাকে । আমাদিগের এই বঙ্গদেশেও সরকারি নানান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনা চলে । কালের আবর্তে সেসবের পাঠের ধারার পরিবর্তন হয় । প্রাথমিক ভাবে আসলেই ছাত্রছাত্রীগণ পার্থিব মোহে নয় আত্মিক বিকাশেই পড়িতে যাইতো; ঠিক চাকরির মোহে নহে । কিন্তু কালে কালে বিবর্তন হয় মানুষের; পরিবর্তন ঘটে বিদ্যার্থীর ।

সময়ের আবর্তে চাকুরির খোঁজ পাইতে গিয়া সকলেই দেখিতে থাকে চাকুরির জন্য দরকার হইতেছে উচ্চ ডিগ্রী । বাঙালি পিতামাতা স্বপ্ন দেখিতে শিখে তাহাদের সন্তান হইবে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার; কিংবা সরকারি বড় চাকুরে, জজ-মেজিস্ট্রেট-সচিব নয়তো উকিল-ব্যারিস্টার । শিক্ষার্জনের সার্টিফিকেট স্বভাবতই অনেকেরই চাকরির নিয়ামক হইয়া উঠে । গুরুজনের চোক্ষে দ্রষ্টিত স্বপ্ন নিজ আঁখিপটে লালন করিয়া হাজারো বাঙালির পুত্রকণ্যা ভর্তি হইতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, মেডিকেল কলেজ সমূহে । সেই ১৯৭০ এর দশকে ঝাঁকে ঝাঁকে বাঙালি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইতো মৌলিক বিজ্ঞান শাখায়; তাহাদের থেকে অনেকেই হইয়াছে বড় আমলা, দেশের মাথা হর্তাকর্তা । দিনে দিনে কমিতে থাকে টাকাপয়সার মূল্য, বাড়িতে থাকে জীবনযাপনের ব্যায়; সরকারি চাকুরির চেয়ে কখনো বেসরকারি চাকরি ও ইঞ্জিনিয়ারিং কিবা ডাক্তারি অধিক লোভনীয় হইতে থাকে; ঝাঁকে ঝাঁক দেশসেরা বাংলাদেশি সুসন্তান সকল বুয়েট/ঢাকা মেডিকেলে পাঠার্জনের চেষ্টায় নিয়ত রীতিমত আদা জল খাইয়া প্রচেষ্টা চালাইতে থাকে; কহিতে লজ্জা নাই আমিও করিয়াছি সে চেষ্টা । কিন্তু তখনো, লোকে কষ্মিনকালেও ভাবিতে পারে নাই যে ৪-৫ বছরের স্নাতক কোর্সে হাসিয়ে খেলিয়া পার করিয়া দেওয়া যাইবে আর নিয়মিত বেতনাদি পরিশোধ করিলেই সময় শেষে হাতে সনদপত্র ধরাইয়া দিবে! স্কুলে-কলেজে তখনো সকলে পড়িতো, শিখিতো — নিগূঢ় তত্ত্ব জানিতে বুঝিতে চেষ্টা তপস্যা করিতো । সেই চেষ্টার ফলশ্রুতিতে এসএসসি, এইচএসসি বিবিধ পরীক্ষা শেষে ভর্তিপরীক্ষা’র যুদ্ধ জয় করে নিজের বুদ্ধির প্রাখর্য ও আত্মিক উন্নয়ন সাধনের অভিলাষ দেখাইয়াই লোকসকল পড়িতে আসিতো । বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকিয়া শিক্ষকদিগের প্রবল চাপে পিষ্ট হইয়া বিদ্যালাভের চেষ্টা করিতেই হইতো । রাজনীতি, সেশনজট, মারামারি এসকলে পতিত হইয়া যদিও পাঠের পরিবেশ দিনে দিনে লাটে উঠিতে থাকে; তবুও বিশ্ববিদ্যালয় মানে যে পড়িবার স্থান, মানসিক সৌকর্য অর্জনের পাথেয় তা সকলেই জানিত ও মানিত । তাই ৪-৫ বৎসরের স্নাতক পাঠ বেশি সময় লাগাইয়া শেষ করিলেও এসকল শিক্ষার্থী কিছু না কিছু বৃহত্তর জীবনের খোঁজ শিখিয়াই বাহির হইতে পারিতো ।

সময়ের বিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ আজ তাহাদের মূল উদ্দেশ্য হইতে বহুদূর চলিয়া আসিয়াছে । বিশেষ, রাজধানী শহরের নানান পাড়া-মহল্লায় গজাইয়া উঠা অর্ধশতাধিক নানাবিধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেকেই কেবলই “টাকা দাও, মজা লও, সনদ লও” মন্ত্রে মন্দ্রিত হইয়া নিশিদিন শিক্ষাউদ্ধার করিতেছে । যেসকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তব্য হইতো নূতন-নবীন কিশোর-তরুণের চোখের ধাঁধা দূর করিয়া, বিষম খাওয়া দুনিয়ার ভেল্কি উন্মোচন করিয়া খোলা নয়নে, উন্মুক্ত মননে জগৎ দেখিবার ও পথ চলিবার নির্দেশ করিবার তাহারাই বরঞ্চ আজিকে এইসকল কচিকাঁচার চোখে রঙিন চশমা পড়াইয়া দেখাইতেছে ধূম্রজালের আভরণে ঢাকা চাকচিক্যমণ্ডিত অলীক জগতের মোহমায়া স্বপ্ন; এসকল তরুণ তরুণীর নেত্রপল্লবে নাচিতে থাকে দুর্লভ সবুজ ফেইরির উদ্বেলিত স্বপ্নসাধ, বক্ষ তাহাদের ভরপুর যেন কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার যত জগজ্জয়ী বীরসুলভ তারুণ্যের আস্থায় উপচাইয়া পড়া ভরপুর মদ…হরদম । তাইতো আজিকে পত্রপত্রিকা খুলিলেই নয়নসমুখে আপতিত হয় সেইরূপ কতিপয় বিদ্যাবিপনীর বিজ্ঞাপন যাহাতে বলা হয়: (আমার নিকট তাহাদের বিজ্ঞাপন শ্রুত হয় ফার্মগেট সহ শহরের-গঞ্জের, হাট-বাজারের হকারদিগের বিজ্ঞাপনের ন্যায়, তাই তাহাদের ভাষাতেই উদ্ধৃত করিলাম)

  • এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িলে আপনি জানিতে পারিবেন কিভাবে বাসে ঝুলিয়া রাস্তার ঝকঝকে গাড়ি দেখিতে দেখিতে সেই গাড়ি কিনিবার স্বপ্ন জাগে ও কিরূপে সে স্বপ্ন পূরন করিতে হয়
  • এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িলে আপনি আরও পাইবেন কতিপয় উদ্ধতযৌবনা নারীসহশিক্ষার্থীনি ও আকর্ষণীয় একঝাঁক হ্যান্ডসাম সুপুরষ সহপাঠী
  • এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িলে আপনি সুন্দর সুন্দরী নানানো আত্মাবন্ধু পাইবেন যাহাদিগের সহিৎ নগরের আনাচে কানাচে একসাথে দিবানিশি যাপন করিতে পারিবেন
  • এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িলে আপনি নার্ডদর্শন বেচারা ছেলে হইতে বিবর্তিত হইয়া পরিণত হইবেন সুদর্শন তরুণীর স্বপ্নপুরুষে

এইরূপ নানাবিধ বিজ্ঞাপনই আজিকে চোখে ভাসিতে থাকে দিকে দিকে!

আজ বুঝিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় মানে নয় “জ্ঞানের ভারে ভারিক্কী চালে আনত নয়নে কিছু নবতর বিশাল নির্মানের ক্ষীণ প্রত্যাশা লইয়া হাড়ভাঙা খাটুনি অন্তে বিদ্যাপাঠ শেষে দুরুদুরু বুকে সংসারের মাঝে বাহির হওয়া” বরং বিশ্ববিদ্যালয় মানে হইতেছে, “সদাউচ্ছল উদ্ধত বক্ষে আস্থার আগ্নেয়গিরি হইয়া বাঁধভাঙা আয়েশী জীবনযাপন শেষে আরও আয়েশী অলীক স্বর্গলাভের মদিরা স্বপ্নে বিভোর হওয়া”।

জয় গুরু দম বাবা

বিঃদ্রঃ, [১], [২], [৩] এইসকল বিজ্ঞাপনের সহিৎ এই রচনার কোনরূপ সংযোগ নাই; তবে এই বিশেষ বিজ্ঞাপনের সহিৎ থাকিলেও থাকিতে পারে ।

এই রচনাটি কুয়েট-এর প্রকাশমাধ্যম কুয়েট লাইভ এর জন্য লিখিত ও একই শিরোনামে প্রকাশিত

১১ই জৈষ্ঠ্য

আজিকে ১১ই জৈষ্ঠ্য – না ইহা ঠিক করিয়া নজরে আসে নাই, জানিতাম আজ ২৫ মে; আশ্চর্য! অথচ আজ কি না প্রিয়কবি নজরুলের জন্মবার্ষিকী ।

বিদ্রোহী কবি, জাতীয় কবি, প্রেমের, রূপ রস, খেয়ালের কবি, গীতিকার, সুরকার, সম্পাদক, দেশপ্রেমে বলীয়ান সৈনিক, স্বাধীনচেতা ঝাকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ আমাদের এই প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম । তিনি জাত কবি, আজন্ম কবি । কাব্যের ছন্দ, সুধা রূপ সুর, চরন-বলন, কাঠামো-গঠন সকলকিছুই যেন তাঁহার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বহমান লীন । তিনি কাব্য রচনা করতেন যেন বাঁচিয়া রহিতে, মানবদেহ যেমন শ্বাস লইতে না পারিলে থাকিতে পারে না তেমনি কাব্যে না মজিলে জাত কবির মন টিকিতে পারে না । তাই শৈশব হইতেই তাহার কাব্যে বসবাস । বাংলার পাশপাশি আরবি ফারসি নানা ভাষায় কাব্যসুধা আস্বাদন করিতে করিতে তিনি লিপ্ত হন নবতর বাংলা কাব্য সৃজনে । অসাধারণ তাহার কাব্যবোধ, অপরূপ তাহার উপমা, আরও অভিনব তাঁহার শব্দচয়ন – সবমিলাইয়া তার রূপায়ন এমনই সব কাব্যের জন্মদান করিয়াছিল যে সেসকল পদ্য কাগজ কলমের, শব্দ অক্ষরের থর-বিথর হইতে অবিরল শব্দে-নৈঃশব্দে ওষ্ঠ্য-কণ্ঠ পার করিয়া হৃদয়ে, মননে পৌঁছুতো লক্ষ-শত বাঙালির শোণিতে তুফান তুলিয়া, চিন্তায় অনুরণন ঘটাইয়া — এমনি চমকপ্রদ তাহার কর্ম । সহজ সরল শিশুতোষ কবিতা (আমার নাম “সাধ” শিরোনামেও একখানা কবিতা ছিল তাঁহার রচিত, যাহা প্রাথমিক শিক্ষালয়ে পাঠ্যও ছিল আমাদিগের), লিচুচোরের ন্যায় কৌতুকছন্দ, বিদ্রোহের কবিতা, কঠিন প্রেমের কবিতা, গজল, শের, ওমরের অনুবাদ, কোরআনের কতিপয় অনুবাদ এমনকি প্রবন্ধ, কথিকা, ভাষণ — গদ্যে, পদ্যে তার বহুরং একই ছন্দে যেন বাংলা সাহিত্যকে অফুরন্ত এক সম্পদরাজি দিয়া গিয়েছে; সাথে যু্ক্ত হইয়াছে তাঁহার রচিত ও সুরপ্রথিত সঙ্গীতসম্ভার ও কতিপয় রাগ ।

সকলই মিলিয়া, কবি নজরুল বিবিধ রূপ লইয়া পরিপূর্ণ এক কবি; আমাদের প্রিয় কবি – বাংলাদেশের জাতীয় কবি । আজিকে তাহার জন্মদিবসে একটুকু কেবলি শ্রদ্ধার, ভালোলাগার নিবেদন ।

শুদ্ধ কহ বঙ্গভাষা, হে বঙ্গজন

বঙ্গভাষা/বাঙ্গালাভাষা/বাংলা ভাষা — আমার প্রাণের ভাষা, মুখের ভাষা, মনের ভাষা, বন্ধুর সহিৎ কথা কইবার ভাষা, শত্রুকের গালাগাল করিবার ভাষা, লিখিবার ভাষা, গান গাহিবার ভাষা, আনন্দ বেদনার অশ্রুর ভাষা । হৃদয় নিঙরানো অভিব্যক্তির প্রকাশ যেমন বাংলা ভাষায় করি তেমনি মনে মনে অবিরল ভাবি এই বাংলাভাষাতেই । এইরূপে বাংলা ভাষা আমাদিগের জীবনের অংশ হইয়া গিয়াছে । তথাপি, বাংলাদেশে কেহ কেহ বাংলা ভাষা লইয়া ঠিক গর্ব করিতে পারে নাই; যাহারা পারে নাই, তাহাদের বিষয়ে কবি লিখিয়াছেন, “যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী ।\ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি ॥

আজিকে বাংলায় চারিদিকে অজানা অচেনা কতিপয় ভাষা শুনিতে পাই, বাঙালির মুখে বোল তোলা এ ভাষা বাংলা নহে; তবে তাহা হিন্দি বা ইংরেজিও নহে — এসকল এক জারজ শংকর ভাষার ন্যায়ই প্রতিভাত হয় । ভাষার নানান রূপ থাকিবে, ঠিক যেমনই এক মায়ের অনেক সন্তান থাকে । বাঙলা ভাষার রহিয়াছে তিনটি মান রূপঃ (১) বলিবার মান্য চলিত কথ্য ভাষা (২) লিখিবার মান্য চলিত লেখ্য ভাষা (৩) পূর্বে ব্যবহৃত লিখিবার সাধু ভাষা । লিখিবার ও বলিবার মান চলিত ভাষা আদতে ও প্রথমে একইরূপ ছিল, কিন্তু বলিবার ভাষা হইতে লিখিবার ভাষা অধিক পরিশিলীত ও লিখিবার চাইতে বলিবার ভাষা অধিক সাবলীল বিধায় প্রয়োগ ক্ষেত্রে মান্য চলিত ভাষা লিখিতে ও বলিতে কিছুটা ভিন্নরূপ শ্রুত ও পঠিত হয় বটে । আর লিখিবার জন্য সাধু ভাষা, যা কিনা বড়ই সুমধুর ও সুমিষ্ট কিন্তু ঠিক ততোটা সাবলীল নহে তাহার ক্রিয়ারূপ ও ব্যবহারের আমেজ কিছু ভিন্ন । আজো দলিলে নথিতে সাধু ভাষা লিখিত হইলেও মূলত ইহার প্রয়োগ নাই বলিলেও চলে, বিগত দশকে ইত্তেফাক পত্রিকা সাধুভাষার পরিবর্তে চলিত ভাষায় লেখা প্রকাশ করিতে শুরু করিলে সাধুভাষা প্রায় হারাইয়া যায় । এই তিন মান ভাষা ছাড়াও রহিয়াছে প্রতিটি অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা, যেমন ময়মনসিংহ জেলা ভাষা, কুষ্টিয়া জেলা হইতে অনেক আলাদা – এইসব আঞ্চলিক ভাষা বহুকাল ধরিয়া গড়িয়া উঠে বিধায় এসকল বাংলা ভাষার সম্পদ । এছাড়াও, ঢাকা শহরের নতুন অধিবাসীগণ – যাহারা বিভিন্ন অঞ্চল হইতে আসিয়াছে তাহারা সকলে একটি বিশেষ রূপে কথা কহেন । একই বিশ্ববিদ্যালয়ে বা পাঠতীর্থেও ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থী থাকে বিধায় সেখানে কথায় বেশ কিছু ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় ।

এইসকল ঠিক ছিল, উপরন্তু বাংলার এই নানারূপ ব্যবহার ভাষাকে সমৃদ্ধ করিয়াই চলিতেছিল; কিন্তু গোল বাঁধিল তখনি যখন কতিপয় পেশার লোক কৃত্রিম কিছু বাংলা ভাষার রূপ আমদানি করিতে থাকিলেন । নতুন কিছু বেসরকারী বেতার মাধ্যমে আরজে বা রেডিও জকি নামে পরিচিত পেশাজীবি নবশিক্ষিত যুবক উত্তরাধুনিক বাংলা ভাষার যে রূপ লইয়া আসে তাহাতে শোনা যায়, আজগুবি উচ্চারণে ইংরেজি উর্দু শব্দে ঠাসা বাংলা ভাষা, যা শুনিলে আমাদিগের মনে হইতে থাকে, কেহ কথকের গলা চাপিয়া ধরিয়াছে ও পশ্চাৎদেশে প্রবল বেগে আঘাত করিতেছে – সেই আঘাতের তালে তাল করিয়া কথক দ্রুত ইংরেজের ন্যায় উচ্চারণে কহিতে থাকে । কোন এক অদ্ভুদ কারণে, বাংলা অভিধানের সুন্দর সুন্দর শব্দ বাদ দিয়া তাহারা ইংরেজি শব্দ ভুলভাবে ব্যবহার করিতে থাকে; কখনো কতিপয় ইংরেজি শব্দ তাহারা এমনেতর অর্থে ব্যবহার করে যাহা খাস ইংরেজেরও অজানা ছিল, আর সেসকল শব্দের উচ্চারণ না হয় ইংরেজের ন্যয় না বাঙালির ন্যায় । একইরূপ উচ্চারণ ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত হয়, নব্য আধুনিক অনেক পেশাজীবি, যাহারা কিছুটা চিবিয়ে বাংলা না বলিলে ঠিক স্মার্ট হওয়া যায় না বলিয়া মনে করে ।
বিশেষ দুঃখের কারণ হইয়া দাঁড়ায় যখন দেখা যায়, বিভিন্ন উচ্চশিক্ষিত লোকজন বাংলায় কথা বলিবার সময় প্রচুর পরিমাণ ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করিতেছে, তাহাদের বাংলা উচ্চারণ উত্তম ও সুন্দর হইলেও বিভিন্ন কথা বলিবার সময় কোন এক কারণে তাঁহারা বাংলা শব্দ খুঁজে পাইবার আগেই ইংরেজি শব্দ ঠোঁটের আগায় চলিয়া আসে; এই শ্রেণীর ব্যক্তিসকল পূর্বে উল্লেখিত শ্রেণীদ্বয়ের ন্যয় ইচ্ছাকৃত ইংরেজি শব্দের বাহার লইয়া বসে না, বরং বাংলা সেসকল শব্দের নিয়মিত ব্যবহার না করিবার কারণেই বাংলা ব্যবহার করিতে ভুলিয়া যায় । এর কারন হিসেবে বলা চলে, বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক, পত্রিকা, নথি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ সকলই ইংরেজিতে পঠিত হয়; হয়তোবা দেশে বিদেশে সেমিনার সকলে লিখন ও পঠণ সকল রচনাই হয় ইংরেজিতে; তাই মস্তিষ্কে ইংরেজি শব্দগুলোই এসকল ধারণার সাথে সরাসরি গাঁথিয়া যায় – মাতৃভাষা বাংলার শব্দই উল্টো যেন অনুবাদ করিয়া স্মরণে আনিতে হয় । এই অসুবিধা ও অনভ্যাস দূর করিতে আসলে আমাদিগের উচিৎ হইবে, বাংলায় পাঠ্যাভ্যাস বৃদ্ধি করা, বিভিন্ন পাঠ্য ও গুরুত্বপূর্ণ মননশীল বই ও জ্ঞানগ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করিয়া বাংলায় পাঠের ব্যবস্থা করা । আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পত্রিকাদির দেশীয় সংস্করণ করিলে তাহা ঠাঁট বজায় রাখিবার তালে ইংরেজিতেই না করিয়া বাংলায় প্রকাশ করা ।

শিশুসকল, কিশোরেরা, ভবিষ্যতের যে প্রজন্ম তার এক বড় অংশ ভাষা শিখিতেছে আজব উপায়ে; কেহ কেহ ঠাঁট ও ভাব বজাইতে গিয়া ইংরেজি মাধ্যমে পড়িতেছে, কেহবা দেশীয় পাঠ নিচ্ছে ইংরেজি ভাষায়, আর যাহারা বাংলাতেই দেশীয় পাঠ নিচ্ছে, তাহারাও নিত্য দেখছে হিন্দি টিভি অনুষ্ঠান – চলচ্চিত্র , শুনিতেছেও হিন্দি গান । তাহারা বাংলায় কথা না বলিয়া তাই হিন্দিতে পারদর্শী হইয়া উঠিতেছে । আরও মজা হইতেছে, যখন আমরা কোন পাকি বা ইন্ডির সাথে সাক্ষাৎ পাই, তখন বাংলা ছাড়িয়া হিন্দি-উর্দু মিশাইয়া কথা কহি; ইংরেজি ব্যবহার করিলেও নাহয় হইতো — আসলে আমাদিগের ভাষাকে মর্যাদাই দিতে চাহি নাই আমরা!

এই যে বাংলা ভাষার নানারূপ লইয়া আর ইহার দূষণ লইয়া এত কথা লিখিলাম, তাহার কারণ মূলত আজিকে প্রাতে পঠিত সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের রচিত এক নিবন্ধ যাহা দৈনিক প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয়তে ‘ভাষা দূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী’ শিরোনামে প্রকাশ হয় । এরই রেশ ধরিয়া উচ্চ আদালত বেতার টিভিতে ভুল উচ্চারণে বাংলা কহিতে নিষেধ করিয়া এক নির্দেশ দেন । এই নির্দেশেই বাংলা ভাষার ভুল ব্যবহার বন্ধ হইয়া যাইবে না; তবে ইহাতে জোর আলোচনা হইবে কিছুকাল, যা কিছুটা হইলেও আমাদিগের সকলের চেতনা কিছুকালের জন্য হইলেও জাগ্রত করিবে – আমরা অনেকেই ভুল বুঝিতে পারিয়া সঠিকভাবে আমাদের এই প্রিয় বাংলা ভাষা ব্যবহারে উদ্যত হইবো ।

আর শুধু ফেব্রুয়ারিকে ভাষার মাস, এসময়ই কেবল “ভাষা ভাষা” করিতে হইবে এমন ধারণা হইতে বাহির হইয়া, বাংলা ভাষাকে সত্যই প্রাণে ধারণ করিলে বৎসরের প্রতিদিনই সুন্দরভাবে সঠিক বাংলা বলিতে ও লিখিতে সচেষ্ট হইতে হইবে ।

কুয়েটে ভোজউৎসব, রণক্ষেত্র – রটনা, ঘটনা

আমার বিশ্ববিদ্যালয় কুয়েটে কি হইয়াছে তাহা লইয়া নানাবিধ যল্পনা-কল্পনা, অনুমান আলোচনা হইতেছে – নানবিধ সংবাদ কর্ণগোচর হইতেছে, যাহার কতিপয় সত্য আর কিয়দংশ গুজব।
বস্তুত, কুয়েটের পরিবেশ পরিস্থিতি এক্ষণে শান্ত – ছাত্ররা সকলে নিজ নিজ বাসগৃহে চলিয়া গিয়াছে, কেহবা খুলনায় ও সন্নিকটস্থ বিবিধ স্থানে আশ্রয় লইয়াছে, কিয়দংশ ছাত্রাবাস সমূহেই পুলিশ, ছাত্রলীগ ও লীগের বহিরাগতদের নিরাপদ প্রহরায় শান্তবস্থায় অবস্থান করিতেছে; তাহারা আর কোনরূপ অশান্তি করিবে না বলিয়া আপন আপন জীবনের কসম লইয়াছে। ছাত্রীরাও অনেকেই হলেই প্রবল নিরাপত্তার মাঝে অবস্থান করিতেছে – বাহিরের অবস্থা ভালো নয় বিধায় অনেকেই টিকেট খরিদ করিয়াও বাসযাত্রা করিতে পারে নাই।

অপরাহ্ণে গুজব ছড়াইয়া যায় যে, একজন ছাত্র নিহত হইয়াছে – যাহা বস্তুত সত্য নহে; যাহার নাম শুনা গিয়াছিল সে চাপাতিতে কুপিত হইয়া বিশেষ আহত হইয়াছে – তথাপি জীবনাশঙ্কা নাহি। অবশ্য, রজানৈতিক ব্যক্তিগন জানাইয়াছে যে, প্রকৃতপক্ষে সামান্য আঘাত পাইয়া ঐ ছাত্র কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান হারাইয়াছিল মাত্র।

গতকল্য একুশে হলের বার্ষিক ভোজ আয়োজন ছিল, যাহার খাদ্যের মান লইয়া সাধারণ ছাত্রসকল বিশেষ মনঃক্ষুণ্ণ হয় – বিশেষত খাদ্যে বাজেট বরাদ্দ করা হইয়াছিল জনপ্রতি ৭৫০ ৮৮৫টাকা যাহা গত বর্ষের ৪৫০ হইতে অধিক। যদ্যপি এবৎসরের জন্য ইহা বিশেষ স্বল্প – দ্রব্যমূল্যের এইরূপ বৃদ্ধি ও নানাবিধ কারনে এই সামান্য অর্থে যে হলের আবাসিক অনাবাসিক সকল ছাত্রকে খাবার দিতে সক্ষম হইয়াছে খাদ্য-কমিটি — ইহাই তো ছাত্রদিগের বিশেষ পাওয়া, প্রকৃতই ইহা কমিটির রাজনৈতিক শক্তিশালী সদস্যদের বিশেষ কৃপা। অথচ স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন ছাত্রসকলে ইহা মানিতে ও বুঝিতে অক্ষম হয় ও প্রভোষ্টের নিকট ইহার প্রতিকার জানিতে চায় – উক্তকালে, কমিটির সদস্য ও তাহাদের সহচরসকল অকুস্থলে উপস্থিত হইলে তাহাদিগকে সাধারন ছাত্রসকল কারন দর্শাইতে কহে ও বাকবিতণ্ডা অন্তে রাজনৈতিকদিগকে হল হইতে বাহির করিয়া দিয়া ফটক লাগাইয়া দেয়, এতদ্ব্যাতীত আরও কতিপয় ঘটনা সংঘটিত হইতে থাকে। অবগতিতে আসে যে, সাধারণ ছাত্রদিগের এহেন দুঃসাহস রাজনৈতিক অনুজদিগের বিশেষ সুনজর প্রাপ্ত হয় নাই বিধায় তাহারা দুপুরে খাইবারকালে ডাইনিং হলে ২কে৭ ব্যাচের ছাত্রসহ পূর্বরাত্রিতে বিরোধিতাকারী দুষ্কৃতিকারীদিগকে শিক্ষাদানে আগাইয়া আসে।

কুয়েটে, কয়েকশত ছাত্র দৌড়াদৌড়ি আর প্রীতিপূর্ণ মল্লযুদ্ধে আহত হইয়াছে মাত্র, কেহ মারা যায় নাই। একুশে হলের পঞ্চম তলায় যাবতীয় বস্তু ভাঙচুর করা সহ সামান্য হামলা হইলেও নিচের তালায় তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয় নাই – দালানের সকল ইট-ই অক্ষত রহিয়াছে; অন্যান্য হলসমূহেরও কোন ক্ষয়ক্ষতি তেমন হয় নাই। মারামারি করিতে সামান্য ধাতব অস্ত্র ব্যবহার হইয়াছে মাত্র – কোন আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়নাই। চাপাতি ব্যবহৃত হইলেও তাহার বিপরীত দিকই মূলত ব্যবহৃত হয়। মল্লযুদ্ধ একতরফা হইলেও অপরপক্ষের সাধারণেরা চুপচাপ রহিয়াছিল। মারামারি প্রশমিত করিতে আগাইয়া গেলে বেশ কিছু শিক্ষক আহত হন ও এক-দুইজন অধ্যাপক হামলার শিকার হইয়া হাসপাতালে গিয়াছেন – সকলেই তো আর মার খান নি ।
বিভিন্ন বর্ষের প্রথম সহ নিরীহ, আঁতেল, চুপচাপ বলিয়া পরিচিত ছাত্রগণ যেমন আহত হইয়াছে তেমন যাহারা সরব হইয়া ঘুরিয়া বেড়ায় তাহারাও একইরূপ মার খাইয়াছে, ভোজের খাবার ভালো না হইলেও মার নামক খাদ্য সমভাবে ও নিরপেক্ষভাবে বন্টনে তাহারা কোনরূপ কার্পন্য করে নাই বলিয়াই জানা যায়। প্রতি দশজনের দু-একজন গুরুতর আহত সহ বাকি সকলেও কমবেশি আহত হইয়াছে।
ইহার ফলশ্রুতিতে ছাত্রগণ অপরাহ্ণে উপাচার্যের নিকট প্রতিকার চাইতে গিয়া শান্তিপূর্ণ অবস্থান করিলেও তাহাদিগকে ছত্রভঙ্গ করিয়া দেয়া হয় – এবং কোনরূপ প্রতিকার না করিয়া কুয়েট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করিয়া সকল হল সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে খালি (হল ভ্যাকান্ট) করিবার নির্দেশ দেয়া হয়; ছাত্ররা ইহা মানিতে না চাহিলেও তাহা বহাল রাখা হয় ও নির্দেশ দেয়া হয় যাহাতে তাহারা নিজনিজ পিতামাতার ক্রোড়ে যাইয়া শিষ্ট হইয়া বসে। অতিদ্রুত হল খালি করা সম্ভবপর না বলিলে মধ্যরাত পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করা হইলেও পরে পুনরায় ছয়টার মধ্যেই হলত্যাগে বাধ্য করা হয়; যদিও অনেকেই আটকা পরিয়াছে।

এসকল ঘটনা সম্পর্কে, “খাবারের মান কোনভাবেই খারাপ ছিল না” মন্তব্য করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক শিবেন্দ্র শেখর কহেন, “একটি মহল বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করতে পূর্বের ন্যায় পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।”

উপরে আলোচিত ঘটনাসকল বিবিধ মাধ্যম হইতে অবগত হইয়াছি, যাহার সত্যতা আমি নিরূপনে অক্ষম। তথাপি ইহা নিশ্চিত তথ্য যে, কুয়েট অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষিত হইয়াছে, এখনো কোন ছাত্র নিহত হয় নাই এবং এক বা একাধিক অধ্যাপক আহত হইয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রহিয়াছে। সংবাদের নিয়মিত মাধ্যম হিসেবে এক্ষণে কার্য করিতেছেঃ তাবাসসুম জাহান

কুয়েটের সমাবর্তন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১২ অনুষ্ঠিত হইবার কথা। কিন্তু এহেন ঘটনায় পূর্বতন শিক্ষার্থীগণ (অ্যালামনাই) সমাবর্তন অনুষ্ঠিত আদৌ হইবে কি না বা তাহাতে যাইতে মন চাহিবে কি না তাহা লইয়া সন্দিহান; অনেকেই এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হইলে সমাবর্তন বয়কট করিবার সিদ্ধান্ত হইবে বলিয়া অবহিত করিয়াছেন।

বর্তমানে কুয়েট শান্ত, কোন অপপ্রচারেই কর্ণপাত করিবেন না। এসকল বিষয় লইয়া চিন্তা না করিয়া বরঞ্চ আপন কর্মে মনোনিবেশ করুন কিংবা নিদ্রাগমণ করুন – আশা করি ভবিষ্যতে এরূপ আরও অনেককিছু শ্রবণের সৌভাগ্য হইবে।